হারেও ঘুচলো এক বছরের আতঙ্ক: ওরেঞ্জ কাউন্টিতে মেক্সিকানদের বাঁধভাঙা পুনরুত্থান

ফন্ট সাইজ:

খেলা শেষ হতেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা আনার কানায় কানায় পূর্ণ লোকাল রেস্তরাঁটার সবাই এক টানে উঠে দাঁড়ালেন। কেউ কেউ মেক্সিকোর সবুজ-লাল-সাদা পতাকা ওড়াচ্ছেন, কেউ আবার বুকভরা হতাশা নিয়েও গলা মেলাচ্ছেন মেক্সিকোর সেই বিখ্যাত লোকসংগীতে- ‘সিয়েলিতো লিন্দো’ (গাও, কেঁদো না)।

মেক্সিকোর ঘরের মাঠ ‘এস্তাদিও আজতেকা’তে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হেরে হয়তো মেক্সিকোর বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সান্টা আনার এই ফুটবল-পাগল মেক্সিকান-আমেরিকান কমিউনিটির মানুষের কাছে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। ১৯৯০ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী লুই লেইলা যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, ‘হারের কষ্ট তো আছেই। কিন্তু যাই ঘটুক না কেন, আমরা আমাদের নিজেদের মানুষদের জন্য সবসময় গলা ফাটিয়ে যাব।’ যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের এই লাতিনো অধিবাসীদের জন্য এই বিশ্বকাপটা ফুটবল টুর্নামেন্টের চেয়েও অনেক বড় কিছু ছিল। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই পুরো সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া জুড়ে যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে, তা এক বছর আগের এক অন্ধকার অধ্যায়ের সম্পূর্ণ বিপরীত।

ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুন মাসের দিকে এই লাতিনো এলাকাগুলো ‘আইসিই’-এর সাঁড়াশি অভিবাসন অভিযানের আতঙ্কে কাঁপছিল। সে সময় উচ্ছেদ আর আটকের ভয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছিল, পরিবারগুলো ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পেত। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের কলামিস্ট গুস্তাভো আরেলিয়ানো এই দৃশ্যকে ব্যাখ্যা করলেন এক ঐতিহাসিক ‘ক্যাথারসিস’ বা আবেগমুক্তি হিসেবে, বললেন, ‘ঠিক এক বছর আগের জুন মাসের কথা ভাবুন। তখন এই রাস্তাগুলো পুরো ফাঁকা ছিল, একমাত্র বিক্ষোভ করা ছাড়া কেউ বের হতো না। আর আজ এক বছর পর... এই বিশ্বকাপ মেক্সিকানদের এবং সামগ্রিকভাবে লাতিনোদের এক বিশাল আবেগমুক্তির সুযোগ করে দিয়েছে।’ এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকো অন্যতম আয়োজক দেশ হওয়ায় এই আনন্দটা আরও বেশি গায়ে লেগেছে অভিবাসীদের। যে মানুষগুলো কিছুদিন আগেও নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাতেন, তারা আজ জনসমক্ষে মেক্সিকোর জাতীয় সংগীত গাইছেন। গুস্তাভো আরেলিয়ানো মনে করিয়ে দেন, ১৯৯০-এর দশকের অভিবাসন-বিরোধী রাজনীতির সময় মেক্সিকোর পতাকা ওড়ানোকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের পরিপন্থী’ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আজ যুক্তরাষ্ট্র যত বৈচিত্র্যময় হচ্ছে, এই সংস্কৃতিও তত ডালপালা মেলছে। মেক্সিকান-আমেরিকানদের কাছে তাদের মেক্সিকান পরিচয় প্রকাশ করার মানে এই নয় যে তারা আমেরিকার নাগরিকত্বকে ভালোবাসেন না। এটা সঙ্গে সঙ্গে দুটি আপন ঘরকে উদযাপনের গল্প।
ইংল্যান্ড প্রথমার্ধেই মেক্সিকোর জালে ২ গোল দিয়ে দেয়। মেক্সিকানদের এই লড়াই নিয়ে আরেলিয়ানো কিছুটা আফসোসের সুরে বলেন, ‘আমার ভেতরের খুঁতখুঁতে মনটা বলে, মেক্সিকোর সঙ্গে সবসময় এমনটাই ঘটে। আমরা ভালো খেলি, কিন্তু বিশ্বের এলিট দলগুলোর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠি না। কিন্তু জানেন তো, আমরা কখনো হাল ছাড়ি না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা লড়েছি।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন