মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসগুলোরও কি আজ মন খারাপ? রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই যখন নরওয়ের ফুটবলাররা উল্লাসে মেতে উঠলেন, ঠিক তখন নিউ জার্সি মাঠের সেন্ট্রাল সার্কেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ৩৪ বছর বয়সী এক জাদুকর। দুই হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। সতীর্থরা এসে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু মানুষটার বুকের ভেতর যে ১৬ বছরের একটা অপূর্ণ স্বপ্নের প্রাসাদ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে! তাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা কারই বা জানা আছে।
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দ্রুততম বিদায়ের এই ট্র্যাজেডির রাতে ফুটবল বিশ্ব দেখলো এক মহাকাব্যের অসমাপ্ত ইতি। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে গ্লোবোর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে লাল হয়ে যাওয়া চোখে নেইমার শুধু এতটুকুই বলার ক্ষমতা রাখলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি, আমি অনেক চেষ্টা করেছি। এখন, সব শেষ। এখানেই শুরু করেছিলাম; এখানেই শেষ করলাম।’
নেইমার নিজে সরাসরি ‘অবসর’ শব্দটা উচ্চারণ করেননি। কিন্তু তার ভাঙা কণ্ঠ আর ‘সব শেষ’ শব্দ দুটির ভেতরের হাহাকার স্পষ্ট বলে দিচ্ছিলÑ হলুদ জার্সিতে ব্রাজিলের রাজপুত্রকে হয়তো আর দেখা যাবে না। আর কী অদ্ভুত নিয়তি! এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ২০১০ সালের আগস্টে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল এক পাতলা গড়নের চঞ্চল ফুটবলারের। সেদিন এই মাঠেই প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করে শূন্যে ঘুষি মেরেছিলেন। আর ১৬ বছর পর, সেই একই মাঠে, চোটজর্জর শরীরে নরওয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে গোল করার পরও তাকে মাঠ ছাড়তে হলো কান্নায় ভেঙে পড়ে। নেইমার পেলের (৯২ ম্যাচে ৭৭ গোল) রেকর্ড ভেঙেছেন আগেই। ব্রাজিলের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হিসেবে নিজেকে আরেকটু উপরে উঠিয়েই রাখলেন তিনি। ১২৯ ম্যাচে নেইমার করেছেন ৮০ গোল। অ্যাসিস্ট করেছেন ৫৯টি।
ব্রাজিল ফুটবল ইতিহাসে নরওয়ে নামটা সবসময়ই একটা অদ্ভুত আতঙ্ক বা ‘অনন্ত জুজু’ হিসেবে পরিচিত। নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিল কখনো জিততে পারেনি। এবার চোটজর্জর নেইমারকে বদলি হিসেবে কার্লো আনচেলোত্তি যখন মাঠে নামান, লক্ষ্য ছিল সেই অভিশাপ ভেঙে হেক্সার পথে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু আর্লিং ব্রট হালান্দের জোড়া গোল আর নরওয়ের শারীরিক ফুটবলের সামনে খেই হারিয়ে ফেললো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ইউরোপ জয়ী আনচেলোত্তিকে আনা হয়েছিল ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের বিশ্বকাপ খরা কাটাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কৌশল খুব একটা কাজে দিল না। ম্যাচ শেষে হতাশ আনচেলত্তি অবশ্য ভবিষ্যতের দিকেই তাকানোর চেষ্টা করলেন, বললেন, ‘সবাই ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে, যেমনটা আমাদের সমর্থকরাও। তবে আমাদের কাজ আমাদের করে যেতে হবে এবং নতুন চিন্তাভাবনা খুঁজতে হবে। এটি খুবই হতাশাজনক ফলাফল। আমরা হারার যোগ্য ছিলাম না, তবে এটিই ফুটবল। আমরা এই পরাজয়কে নতুন চক্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করবো।’
যে ছেলেটি সান্তোসের রাস্তায় খালি পায়ে প্লাস্টিকের বল ড্রিবল করতে করতে বড় হয়েছিল, তার এই বিদায়টা বড্ড বেমানান। সেই রাস্তার ফুটবলার থেকে নেইমার হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের অন্যতম ‘গ্লোবাল আইকন’। ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফারে পিএসজিতে যাওয়া, বার্সেলোনার হয়ে ট্রেবল জয়, পুমার মতো ব্র্যান্ড থেকে বছরে ৩০ মিলিয়ন ডলার আয়Ñ সব মিলিয়ে ২০২৬ সালে এসে নেইমার প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ওপর) এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের মালিক। তার ক্যারিয়ারের মোট আয় ছাড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু ফুটবল বিধাতা তাকে কোটি কোটি টাকার বৈভব দিলেও, একটি সোনালী ট্রফির জন্য তার হাহাকার দূর করলেন না। ৪টি বিশ্বকাপে গোল করা ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান (পেলের পর) হয়েও, পেলের মতো ট্রফি উঁচিয়ে ধরার সৌভাগ্য তার হলো না।
নেইমারের পুরো ক্যারিয়ারটাকে দেখলে আসলে মনে হবে এক করুণ ট্র্যাজেডির গল্প, যেখানে প্রতিভার ডালপালায় বারবার কুঠারাঘাত করেছে ইনজুরি। এই বিশ্বকাপেও ডান পায়ের কাফ ইনজুরির কারণে ৫ ম্যাচের মধ্যে মাত্র ২টিতে মাঠে নামতে পেরেছেন। তাও বদলি হিসেবে। গ্রুপ পর্বে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ১৫ মিনিটের উপস্থিতি, আর নরওয়ের বিপক্ষে যখন দল ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে, তখন ৬৭ মিনিটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেঞ্চ থেকে মাঠে নামাÑ এই ছিল তার শেষ বিশ্বকাপের গল্প। মাঠে নেমে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফিরিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যদেবতা ততক্ষণে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
পেশাদার ফুটবলে নেইমার এখন খেলছেন তার শৈশবের ক্লাব সান্তোস এফসিতে। হয়তো আরও কিছুদিন ক্লাব ফুটবল খেলবেন। কিন্তু ব্রাজিলের সেই বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটা এবার রাজপুত্র ছাড়াই পথ চলবে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো কিংবা এন্ড্রিকদের মতো নতুন প্রজন্মের কাঁধে ব্যাটন বুঝিয়ে দিয়ে নেইমার বিদায় নিলেন এক বুক অপূর্ণতা নিয়ে।
