এ মাসের প্রতিটি ক্ষণ ও সময় অত্যন্ত মূল্যবান। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীতে এ মাসের বিভিন্ন সময় ও অবস্থা সম্পর্কে অনেক মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও আরও অনেক কারণে রমজান মহিমান্বিত একটি মাস। তাই স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম রমজানে নফল ইবাদত ও নেক আমলের পরিমাণ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতেন। হাদিসের ভাষ্য হলো, নবীজি রমজান মাসে বিশেষ করে শেষ দশকে নেক আমলের জন্য কোমর বেঁধে নামতেন।
পবিত্র কোরআন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের প্রতি আল্লাহতাআলার একটি বিশেষ নিআমত। কোরআন এমন আলো, এমন পাথেয় ও সম্বল, এমন সঙ্গী ও পথনির্দেশক, যার অনুগামী না হলে বান্দা পথ হারাবেই, যা সঙ্গে না রাখলে মুমিন নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চলতে থাকবে। আল্লাহতাআলা সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনুল কারিম নাজিল করেছেন এজন্য, যাতে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে যত জায়গায় যত মানুষ জন্মগ্রহণ করবে, সবাই আখেরি নবীর অনুসরণ করে এই কোরআনের আলোয় পথ চলে এবং এর বিধানাবলীর ওপর আমল করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়াসাল্লামও জীবনভর মানুষকে কোরআনের বার্তা ও বিধান বুঝিয়ে গেছেন। আর উম্মতকে নির্দেশ দিয়েছেন জীবনের সর্বক্ষেত্রে এই কোরআন ও তাঁর হাদিসকে ভালোভাবে আঁকড়ে ধরতে। মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই সম্বল মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আল্লাহতাআলা রমজান মাসেই নাজিল করেছেন। কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, রমজান মাস; যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে। যা মানুষের জন্য (আদ্যোপান্ত) হেদায়েত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং (সত্য ও মিথ্যার মধ্যে) চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেয়। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৫)
মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবলম্বন কোরআনুল কারীমের প্রতি মুমিনের অনেক হক রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানতম হলো সহিহ-শুদ্ধভাবে কোরআন তিলাওয়াত শেখা। কোরআন তিলাওয়াত শেখা তো সকল মুসলমানের জন্যই ফরজ। কোনো মুসলিমের জীবন কোরআন শেখা ছাড়া চলতেই পারবে না। মুমিন-মুসলমানের প্রতি সবচেয়ে বড় বিধান ‘নামাজ’। কোরআন না শিখলে নামাজ আদায় করা সম্ভব নয়। কাজেই অন্ততপক্ষে নামাজ আদায় করা যায়- এই পরিমাণ অংশ তো শিখতেই হবে। এছাড়াও কোরআন তিলাওয়াত স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদিসে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবনে আমরা দেখতে পাই, তারা কতো বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতেন। আর রমজান মাসে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এর পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিতেন। হাদিসে এ-ও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম রমজানে পরস্পরকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। (বুখারি, হাদিস নম্বর-৩২২০, মুসনাদে আহমাদ)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু হাদিসে কোরআন তিলাওয়াতের ফজিলত ও তিলাওয়াতকারীর মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে- যে ব্যক্তি কোরআন তিলাওয়াতে পারদর্শী, সে অতি মর্যাদাবান পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবে। আর যে কষ্ট করে আটকে আটকে কোরআন তিলাওয়াত করে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব। (মুসলিম, হাদিস ৭৯৮; বুখারি, হাদিস ৪৯৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ২৪৬৬৭, ২৫৩৬৫)
এ হাদিসে যে ব্যক্তি ভালোভাবে কোরআন পড়তে পারে, তার জন্য যেমন বিশাল সুসংবাদ রয়েছে, তেমনিভাবে কষ্ট করে ঠেকে ঠেকে যে পড়ে, তার জন্যও দ্বিগুণ সওয়াবের ঘোষণা রয়েছে। এক সওয়াব হলো, কোরআন তিলাওয়াতের, আরেক সওয়াব তার কষ্টের বিনিময়ে। যেখানে বান্দার কর্তব্যই হলো কোরআন শেখা, তাকে এটা শিখতেই হবে, সেখানে আল্লাহতাআলা তার এই কষ্টের জন্যও আবার আলাদা করে সওয়াব দিচ্ছেন। এছাড়া আরও বহু হাদিসে কোরআন তিলাওয়াতকারী আখেরাতে কী বিপুল নিআমত লাভ করবে, কোরআন তাকে আখেরাতের দুর্দশা থেকে কীভাবে বাঁচাবে সে সকল কথা বর্ণিত হয়েছে।
কোরআন নাজিলের এই বরকতময় মাসে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, যারা সহীহ-শুদ্ধভাবে কোরআন পড়তে পারি না, অবশ্যই কোরআন পড়া শিখবো। এমনিই তো কোরআন শেখা আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য, তথাপি শিখতে গিয়ে কষ্ট হলে এর প্রতিদানস্বরূপ এবং এই মাসের বরকতে আল্লাহতাআলা দ্বিগুণ থেকে বহু গুণে বাড়িয়ে সওয়াব দেবেন ইনশাআল্লাহ। আর যারা ইতিমধ্যেই কোরআন পড়তে শিখেছি, আমরা যত বেশি সম্ভব কোরআন তিলাওয়াত করব। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম ও হাজার বছর ধরে আমাদের সালাফে সালেহীনের রমজান মাসের অন্যতম প্রধান আমল ছিল বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা ও শোনা। আল্লাহতাআলা তাওফিক দান করুন।
