বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আমরা

বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আমরা

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপে আটচল্লিশটি দেশ খেলছে। এই আটচল্লিশটি দেশের পতাকা সবগুলোই বাংলাদেশের মাটিতে উড়ছে- এটা বলা যাবে না। তবে অনেক দেশের পতাকা বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে। সারা দেশে বিশেষ করে ঢাকা সহ শহরগুলোর ছাদে উড়ছে সমর্থিত দেশের পতাকা। সঙ্গে অবশ্যই বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা তো আছেই। চ্যানেল আইও স্টেডিয়ামের আদলে একটি জায়গা তৈরি করেছে। সেখানেও অনেক দেশের পতাকা উড়ছে। অবশ্য বাংলাদেশে এই আটচল্লিশটি দেশের পতাকা পাওয়াও দুঃসাধ্য। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা বিখ্যাত তারা চ্যানেল আইতে আসছেন এবং গোল করছেন। আনন্দ উপভোগ করছেন।

ফুটবলার কিংবা রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে মিডিয়া জগতের তারকারা এই খেলায় অংশগ্রহণ করছেন। আর্জেন্টিনার অ্যাম্বাসেডরও এসেছিলেন সেদিন। তিনি তো আমাদের এই কার্যক্রম দেখে উৎফুল্ল। মেসির কাটআউট নিজের সংগ্রহে নিয়ে গেলেন। বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা ম্যারাডোনার সাইন করা মগ উপহার দেয়া হলো তাকে। এটাও এক মহাযজ্ঞ। তবে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার যে সমর্থক তারা সারা দেশে যে হারে দুই দেশের পতাকা উড়িয়েছে সেটা অকল্পনীয়। এই মাত্রা যেন এবছরে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সমর্থিত দলের জার্সি গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কি ছেলে, কি বুড়ো সবাই জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রিয় দলের বিজয়ের দিনে বুক ফুলিয়ে আনন্দ চিত্তে উপভোগ করছেন। গর্বে তার বুক ভরে যাচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড-এর সমর্থকও কম নয়। এসব দেশের জার্সিও প্রচুর লোক পরে। এবারের খেলাগুলো আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে মধ্যরাতে বা শেষ রাতে। এটা হচ্ছে দেশের অবস্থানের কারণে। যেহেতু এবারে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে মেক্সিকো, আমেরিকা এবং কানাডাতে তাই সময়ের তারতম্যের কারণে আমাদের দেশে মধ্যরাত থেকে এই খেলা দেখা যাচ্ছে। মানুষ রাত জেগে খেলা দেখছে।

এই খেলা নিয়ে হচ্ছে আলোচনা সমালোচনা। খেলা কেমন হলো, কার দল জিতে গেল, কার দল হেরে গেল- খেলা নিয়ে বিশ্লেষণ হচ্ছে। প্রত্যেকেই যেন গবেষক। এসব দেখতে ভালোই লাগছে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে অফিস পাড়াও এখন ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। আগে আমরা দেখেছি সবখানে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে। এখন আর সেই আলোচনা শোনা যাচ্ছে না। এখন আলোচনা হচ্ছে মেসির হ্যাটট্রিক নিয়ে। নবাগত কেপ ভার্দে রুখে দিলো স্পেনকে। তারা রুখেই দেয়নি, স্থান করে নিয়েছে শেষ ৩২-এ। আবার ব্রাজিলের ভিনির বাতিল করা গোলটি কেন বৈধ নয় সেসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে কে হবে সর্বোচ্চ গোলদাতা- সেটাও আলোচনার বিষয়। তার মানে ফুটবল নিয়ে আমাদের ভালোবাসার অন্ত নেই। এর আগে আমি অন্য একটি লেখায় লিখেছিলাম অন্যান্য দেশের পতাকার সঙ্গে আমাদের পতাকাও উড়ছে। এর কারণ বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাঙালিরা আমেরিকা, মেক্সিকো ও কানাডাতে যারা স্টেডিয়ামে খেলা দেখছেন তারা তাদের সমর্থিত দল বা দেশের পতাকার পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকাটিও তুলে ধরছেন।

পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের পতাকা দেখছে। যারা বিশ্বকাপে খেলছে না তাদের ভেতর বাংলাদেশ ছাড়া অন্যদেশের পতাকা দেখা যায় না। আমাদের অফিসের আশপাশে খেলার সরঞ্জাম বিক্রি করে এরকম কয়েকটি দোকান আছে। তারা জানালো তাদের দোকানে প্রতি বছর যে ফুটবল বিক্রি হয় তারচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বিশ্বকাপ চলাকালীন এই একমাসে। ফুটবলের কথা মনে হতেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের ছেলেবেলায় ফুটবল ছিল অন্যরকম। ফুটবলের ভেতরে ব্লাডার থাকতো। সেই ব্লাডার পাম্প করে ফুটবল ফোলাতে হতো। আরেকটি ছিল জুতার ফিতার মতো দু’দিক থেকে টেনে ধরে ফুলাতে হতো এরকম ফুটবল দিয়ে আমরা খেলতাম। সেই ফুটবলের যুগ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এখন আধুনিক ফুটবল। এই ফুটবল ব্যবহার অনেক সহজ।

কিন্তু সে কারণে তো আর দোকানে ফুটবল বেশি বিক্রি হচ্ছে না। এই একমাসে যে ফুটবল বিক্রি হচ্ছে সেগুলো কি শুধু খেলোয়াড়েরা কিনছে? তা তো নয়। এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ফুটবল কিনছে। এই ফুটবল কিনে উপহার দিচ্ছে কাকে? কারণ ফুটবল কিনে তো নিজের বাড়িতে রাখছে না। কাউকে না কাউকে তো দিচ্ছে। পাঁচ বছরের মায়রা-মায়রনের মতো ছোটদেরকে উপহার দিচ্ছেন। তারা ফুটবল নিয়ে খেলা করছে। শট মারছে। তারচেয়ে যারা একটু বড় তারা ফুটবল নিয়ে মাঠে খেলতে যাচ্ছে। এই যে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ফুটবল উপহার দেয়া কিংবা তাদের কাছে তুলে দেয়া তার কিন্তু একটাই উদ্দেশ্য ফুটবলকে জনপ্রিয় করা। ফুটবল খেলা সম্পর্কে জানানো। ফুটবলের প্রতি যেন ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসা জন্মায় সেই চেষ্টা করা। আমাদের আগামী প্রজন্ম ভালো ফুটবল খেলবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এজন্য আমাদের ফুটবল ফেডারেশন কিংবা সরকার কী করবে তার জন্য অপেক্ষা করেনি। আমরা জানি ফুটবলে যদি ভালো করি তাহলে শুধু পতাকা উড়িয়েই গর্ব করবো তা কিন্তু নয়। যদি ভালো খেলোয়াড় তৈরি হয় তাহলে পৃথিবীর দর্শকদের কাছে যাওয়ার গর্ব সেটা আমরা পাবো। আমাদের সেই পাওয়াটার যে প্রতিফলন সেটা সবার ভেতরে রয়েছে তার বড় প্রমাণ ফুটবলের দোকানের এই ফুটবল বিক্রি। বাংলাদেশের পতাকা আরও বেশি বিক্রি। ছোট-বড় হাজার হাজার জার্সি বিক্রি। আমাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।

চ্যানেল আইয়ের ছোট্ট মাঠটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ লোক আসছেন এবং ছোট গোলপোস্টে গোল করে আনন্দ উপভোগ করছেন। চলচ্চিত্র, টেলিভিশনের সেলিব্রেটিসহ বিভিন্ন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আছেন সেই তালিকায়। সবাই গোল করছেন তা নয়। গোল না করতে পারার ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে গিয়ে হইচই করে উঠছেন। মনে মনে ভাবছেন আমি তো অনেকদিন পর ফুটবলে শট দিলাম। ফুটবলকে ভালোবাসার এই প্রক্রিয়াকে যদি আমরা অব্যাহত রাখতে পারি তাহলে সত্যি সত্যি আমরা একদিন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবো। যারা এখন অন্যদেশকে সমর্থন দিচ্ছে তারা বুঝবেন আমাদের বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। আমাদের বাংলাদেশও ফুটবল খেলা জানে। নতুন প্রজন্ম হয়তো আমাদের অপেক্ষায় থাকার অবসান ঘটাবে। আমাদেরকে উপহার দেবে সুন্দর একটি ফুটবল। সবাই ভালো থাকবেন। নিজের দেশকে নিয়ে আশা করতে তো দোষ নেই। বাংলাদেশ অবশ্যই একদিন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন