৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চ, দল গঠনের আগে ইবোলার কারণে ২১ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন, আর দেশের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। গল্পটা ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর। এতসব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে আটলান্টার সবুজ গালিচায় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রূপকথা লিখতে যাচ্ছিল তারা। বিশ্বের ৪ নম্বর দল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ বত্রিশের ম্যাচে নেমে ৭৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল ৪১ নম্বরে থাকা আফ্রিকান দেশটি। কিন্তু শেষ ১৫ মিনিটে হ্যারি কেইনের অতিমানবীয় জোড়া গোলের ঝড়ে ২-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হলো লেপার্ডদের। তবে মাঠের এই হার ছাপিয়ে পুরো ফুটবলবিশ্বের মন জয় করে নিয়েছে ডিআর কঙ্গোর ফুটবলারদের মাঠ ও মাঠের বাইরের অবিশ্বাস্য লড়াই।
দলটির স্কোয়াডের ২৬ খেলোয়াড়ের মধ্যে ২০ জনেরই জন্ম কঙ্গোর বাইরে, মূলত ফ্রান্সে। খনিজ সমৃদ্ধ পূর্ব কঙ্গোর যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে পরিবারগুলো একদিন ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিল। আজ সেই সন্তানদের হাত ধরেই বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো দেশটি। বেলজিয়ামের বয়সভিত্তিক দল ছেড়ে কঙ্গো জাতীয় দলকে বেছে নেয়া সান্ডারল্যান্ড মিডফিল্ডার নুয়াহ সাদিকি ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপ-কে বলেন, ‘এখন এমন একটা নতুন প্রজন্ম এসেছে, যারা যেকোনো উপায়ে নিজেদের দেশের মানুষকে সাহায্য করতে চায়।’
মাঠে সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতেই যেন জানপ্রাণ লড়েছেন নিউক্যাসল স্ট্রাইকার ইয়োয়ান উইসা। গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল ও উজবেকিস্তানের বিপক্ষে গোল করে দলকে এই মঞ্চে নিয়ে আসার অন্যতম নায়ক তিনি। নিজের লড়াই ও দেশের ট্র্যাজেডি নিয়ে ম্যাচের পর উইসা বলেন, ‘আমাদের দেশে পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। পূর্ব কঙ্গোয় প্রতিনিয়ত যুদ্ধ চলছে। আমরা যখনই এই জার্সিটা গায়ে তুলি, প্রতিবারই ওদের কথা ভাবি। কারণ আমরা শান্তি চাই। আমরা আসলে একদম শূন্য থেকে শুরু করে এতদূর এসেছি। এখন কালো কলমে আমরা আমাদের নিজেদের ইতিহাস লিখছি এবং এই ইতিহাস নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত।’
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে নিজের দল নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাবেও। তিনি বলেন, ‘যতটা না হতাশ, তার চেয়ে বেশি গর্বিত। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়া সত্যিই হতাশার। তবে আমাদের চেয়ে অনেক ওপরের র্যাঙ্কিংয়ের দলগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা ভালো ফুটবল খেলেছি।’
তবে মাঠের এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের রাতে এক চরম ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয়েছে কঙ্গো কোচকে। ম্যাচ এবং দলের বিশ্বকাপ মিশন নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ শেষ করার ঠিক আগমুহূর্তে দেসাবে জানতে পারেন তার বাবার মৃত্যুর খবর। কঙ্গো ফুটবল ফেডারেশনের মিডিয়া কর্মকর্তা জেরি কালেমো সংবাদ সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে কোচের বাবার মৃত্যুর খবর ঘোষণা করেন। এই আকস্মিক খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে যান দেসাবে, কয়েক মুহূর্তের জন্য তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়নি। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লা দোফিনে’ ফেডারেশনের এই তথ্য জানানোর প্রক্রিয়াকে ‘মর্মান্তিক ও কাণ্ডজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছে। কক্ষ ছেড়ে যাওয়ার আগে ফরাসি এই কোচ শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করতে পারেন- মের্সি’ (ধন্যবাদ)।
