‘বুড়ো ’ বেলজিয়ামের অবিশ্বাস্য কামব্যাক, স্বপ্নভঙ্গ সেনেগালের

১২৫ মিনিটের রূপকথা

‘বুড়ো ’ বেলজিয়ামের অবিশ্বাস্য কামব্যাক, স্বপ্নভঙ্গ সেনেগালের

ফন্ট সাইজ:

ম্যাচের ঘড়িতে তখন ৮৫ মিনিট। সিয়াটল স্টেডিয়ামের স্কোরবোর্ড জানাচ্ছে বেলজিয়াম ০-২ সেনেগাল। বেলজিয়ামের তথাকথিত ‘সোনালি প্রজন্ম’ তখন আরেকবার বড় মঞ্চে মুখ থুবড়ে পড়ার শঙ্কায়। ডাগআউটে বসে থাকা কেভিন ডি ব্রুইনা কিংবা জেরেমি ডকুদের চোখে-মুখে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিষাদময় সমাপ্তির স্পষ্ট ছাপ। তবে ফুটবল যে কত বড় নাটকের মঞ্চ, তা প্রমাণ করতেই হয়তো পরের ৪০ মিনিট বরাদ্দ ছিল।

৩ মিনিটের ম্যাজিকে সমতায় ফেরা এবং ১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে দেরিতে হওয়া জয়সূচক পেনাল্টি গোল! সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে শেষ ষোলোর টিকিট কাটে বেলজিয়াম। ২০১৮ সালে জাপানের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ৩-২ ব্যবধানে জেতার সেই ঐতিহাসিক রূপকথাই যেন সিয়াটলে ফিরিয়ে আনলো রেড ডেভিলরা।
অথচ ম্যাচের শুরু থেকে গল্পটা ছিল আফ্রিকার তেরাঙ্গা লায়নদের। ২৪ মিনিটে ইসমাইলা সারের হেড পোস্টে লেগে ফিরে এলে ফিরতি শটে সেনেগালকে এগিয়ে নেন হাবিব দিয়ারা। ৫১ মিনিটে ইসমাইলা সার দেখান তার একক জাদুকরী কারিশমা। মুসা নিয়াকাতের দূরপাল্লার পাস বুক দিয়ে নামিয়ে, দারুণ এক ভলিতে থিবো কোর্তোয়াকে পরাস্ত করে ব্যবধান বাড়ান ক্রিস্টাল প্যালেসের এই ফরোয়ার্ড। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের মোট গোলসংখ্যা ৫-এ নিয়ে গিয়ে আফ্রিকার সর্বোচ্চ গোলদাতা আসামোয়া জিয়ানের (৬ গোল) ঘাড়েই নিঃশ্বাস ফেলছেন সার। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে ফরাসি কোচ রুডি গার্সিয়া যখন দলের দুই প্রাণভোমরা ডি ব্রুইনা ও জেরেমি ডকুকে তুলে নেন, তখন গ্যালারিতে বেলজিয়ান সমর্থকদের স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ডকু মাঠ ছাড়ার সময় অসন্তোষ প্রকাশ করেন, ডি ব্রুইনাও ছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তবে গার্সিয়ার এই জুয়া এবং বদলি খেলোয়াড়দের আক্রমণাত্মক মনোভাবই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেয়। ৮৪ মিনিটে সাদিও মানের শট কোর্তোয়া দুর্দান্তভাবে রুখে না দিলে হয়তো তখনই বেলজিয়ামের বিদায় নিশ্চিত হয়ে যেতো।
এরপর শুরু হয় বেলজিয়ামের প্রত্যাবর্তনের গল্প। ৮৬ মিনিটে টমাস মুনিয়েরের ক্রস থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলের হয়ে ৮৬তম আন্তর্জাতিক গোলটি করেন বদলি নামা রোমেলু লুকাকু। ৩ মিনিট পর লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের চমৎকার ক্রস থেকে বাতাসে ভেসে দুর্দান্ত হেডে সেনেগাল গোলকপার মোরি দিয়াওকে বোকা বানান ইউরি টিলেমানস। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

১২০ মিনিটের খেলা শেষে যখন সবাই টাইব্রেকারের মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের চরম নাটকীয় মোড়। ডি-বক্সে লামিন কামারা ফাউল করে বসেন টিলেমানসকে। রেফারি সাইদ মার্তিনেস ভিএআর মনিটরের দিকে ছুটে যান এবং পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। সেনেগালের খেলোয়াড়রা পেনাল্টি স্পট ঘিরে প্রতিবাদ করতে থাকেন, পাথে সিস মাঠে শুয়ে পড়ে পেনাল্টি শট বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন। তবে ১২৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ডে ঠান্ডা মাথায় স্পট কিক থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে বেলজিয়ামকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট এনে দেন টিলেমানস। ম্যাচ শেষে কোচ রুডি গার্সিয়া বলেন, ‘ফুটবল হলো আবেগের খেলা। এখানে কোনো কিছুই আগে থেকে হেরে যায় না, আপনাকে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস রাখতে হবে।’
ম্যাচের মাঝপথে হাইড্রেশন ব্রেকে টিলেমানস ও ট্রোসার্ডের মধ্যকার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। শিষ্যদের মাঠের ভেতরের সেই ঝগড়া ও আগ্রাসনকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বেলজিয়াম বস। তিনি বলেন, ‘লুকাকু ওদের দুজনকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। আমি জানি না ওরা কেন তর্ক করছিল। তবে মাঠের ভেতর এই ধরনের জেদ বা তেজ আমার পছন্দ। ১৮ মাস আগে যখন আমি এই দলের দায়িত্ব নিই, আমার মনে হয়েছিল বল পায়ে ওরা খুব ভালো হলেও যথেষ্ট আগ্রাসী ছিল না। এভাবে আপনি বড় টুর্নামেন্টে ফল পাবেন না। আপনাকে মাঠে শক্ত হতে হবে, লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। আমরা যদি এই মানসিকতা ধরে রাখতে পারি, তবে আমরা অনেক দূর যাবো।’ ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও এমন হৃদয়বিদারক হারের পর সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও নিজের হতাশা লুকাতে পারেননি। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে সেনেগালের ঐতিহাসিক কোয়ার্টার ফাইনাল যাত্রার এই সদস্য ম্যাচ শেষে বলেন, ‘এটা খুবই নিষ্ঠুর এবং বেদনাদায়ক একটি পরাজয়। আমাদের হাতে সব সুবিধা ছিল, আমরা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু একটা ফুটবল ম্যাচ তো আর ৮৫ মিনিটের হয় না! বেলজিয়াম ম্যাচে ফিরে এসেছিল এবং আমরা সেই চাপটা শেষ মুহূর্তে আর সামলাতে পারিনি।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন