সবুজ গালিচায় তখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একঝাঁক বিধ্বস্ত শরীর। গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে ওঅ্যাসিস ব্যান্ডের অমর গান- ‘ওয়ান্ডারওয়াল’। আটলান্টা স্টেডিয়ামের বিশাল ভিক্টোরিয়ান রেলওয়ে ডোম আকৃতির ছাদের নিচে তখন যেন এক পরম মুক্তির আনন্দ। ঠিক ১৫ মিনিট আগেও দৃশ্যটা ছিল নরকের মতো। থমাস টুখেলের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, জুড বেলিংহামের চোখে-মুখে একরাশ হতাশা আর ডেকলান রাইসের দিশাহারা দৌড়াদৌড়ি। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর কাছে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ড তখন দাঁড়িয়ে ছিল আরও একটি ‘জেনারেশনাল ট্রমা’ বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়ানোর মতো এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের দোরগোড়ায়।
এমন সময় দৃশ্যপটে আগমন ‘দ্য ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব হ্যারি কেইনে’র। থমাস টুখেলের চাকরি, ফুটবল এসোসিয়েশনের কর্তাদের সম্মান আর পুরো ইংল্যান্ডের ফুটবলীয় অস্তিত্ব যখন সুতোয় ঝুলছিল, তখন ১১ মিনিটের এক অতিমানবীয় ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলেন অধিনায়ক। কেইনের জোড়া গোল। ২-১ গোলের এই জয় শুধু ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে তোলেনি, বরং ফুটবল ইতিহাসের পাতায় টুকে দিয়েছে অবিশ্বাস্য রেকর্ডের মহাকাব্য।
এই এক জয়ের রাতেই ৩২ বছর বয়সী কেইন নিজেকে নিয়ে গেছেন পেলে কিংবা জুস্ট ফন্টেইনের মতো কিংবদন্তিদের পাশে। বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৩-তে নিয়ে গিয়ে কেইন পেছনে ফেলেছেন খোদ ফুটবল সম্রাট পেলের ১২ গোলের রেকর্ড। থিওফিলো কুবিলাস, মিরোস্লাভ ক্লোসা, থমাস মুলার, লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের পর বিশ্বের মাত্র ষষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে দু’টি ভিন্ন বিশ্বকাপে ৫ বা তার বেশি গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।
নকআউট
পর্বে কেইনের গোল এখন ৫টি, যা জিওফ হার্স্টের সমান এবং গ্যারি লিনেকারের (৬ গোল) চেয়ে মাত্র একটি কম। বিশ্বকাপে আগে গোল হজম করেও ইংলিশরা ম্যাচ জিতে মাঠ ছাড়লো মাত্রই দ্বিতীয়বার। প্রথমটি ৬০ বছরের পুরনো ঘটনা। ১৯৬৬ সালের সেই বিখ্যাত ফাইনাল। আলো ছড়ালেন ৬১ মিনিটে বেঞ্চ থেকে উঠে আসা অ্যান্থনি গর্ডনও। কেইনের দু’টি গোলেই অ্যাসিস্ট করা গর্ডন ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে দু’টি অ্যাসিস্ট করলেন। এই জয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে নিজেদের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ১০ ম্যাচে (৬ জয়, ৪ ড্র) নিয়ে গেল ইংল্যান্ড।
ট্যাকটিক্সের টেবিলে অবশ্য কঙ্গোর কোচ সেবাস্তিয়েন দেসাবে প্রায় হারিয়েই দিয়েছিলেন টুখেলকে। প্রথাগত ৫-৩-২ ফরমেশন ভেঙে আচমকা ৪-৪-২ ছকে দল নামিয়ে টুখেলের হাই-প্রেসিং স্ট্র্যাটেজিকে বোকা বানায় কঙ্গো। ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই ব্রায়ান সিপেঙ্গার নিচু শট যখন জর্ডান পিকফোর্ডের জাল কাঁপায়, তখন মাঠের ভেতর যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমার্ধের শেষে ইয়োয়ান উইসার ০.৬১ এক্সজি-র (এক্সপেক্টেড গোল) সহজ সুযোগটি যদি গোল হতো, তবে কঙ্গো ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচ ওখানেই প্রায় শেষ করে দিতে পারতো। টুখেল সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে শান্ত থাকার চিৎকার করলেও, মাঠে তখন ২০১৬ সালের আইসল্যান্ড ট্র্যাজেডির ভূত তাড়া করছিল সবাইকে। টুখেল অবশ্য জুয়াটা খেললেন শেষ হাইড্রেশন ব্রেকের পর। রাইসকে রাইট-ব্যাকে নামিয়ে, বুকায়ো সাকা আর এবেরেচি এজেকে মাঠে এনে তিনি তৈরি করলেন তার প্রিয় ‘ওয়াইড ইউনিট’। বেলিংহাম বাঁ প্রান্তে সরে যেতেই খোলস ছেড়ে বের হয় ইংল্যান্ড। আর বাকি কাজটা সারলেন কেইন এবং গর্ডন। প্রথমে গর্ডনের নিখুঁত ক্রসে কেইনের বুলেট হেড, যা ১৯৬৬ সালের পর ক্লোসা (৭) ও গার্ড মুলারের (৫) পর কেইনকে বিশ্বকাপের তৃতীয় সর্বোচ্চ হেডার গোলদাতা (৪টি) বানালো। পরে গর্ডনের পাস থেকে বক্সের ভেতর কেইনের সেই ডান পায়ের নিষ্ঠুর, বিধ্বংসী শটÑ যা কঙ্গোর গোলকিপার লিওনেল এমপাসির হাতকে পরাস্ত করে জালে জড়ালো। ম্যাচের পর মাঠের মাঝখানেই পুরো দলকে গোল করে বৃত্ত বানিয়ে এক ঐতিহাসিক বার্তা দেন কেইন। সুপার-সাব গর্ডন পরে জানান, কেইন নাকি বলছিলেন- ‘এই জয় আমাদের টুর্নামেন্ট জিতিয়ে দেয়নি, তবে বড় দলগুলোর একটা রোগ আছে। তারা অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে জয় উদ্যাপন করতে ভুলে যায়।
আমাদের অন্য দেশের মতো এই কঠিন জয়টাকে মন থেকে উপভোগ করতে হবে।’ তবে উদ্যাপনের সময় বড্ড কম। শেষ ১৬-তে মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের মুখোমুখি হতে হবে ইংলিশদের। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭,২০০ ফুট উঁচুতে পাতলা বাতাসে খেলার শারীরিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইতিমধ্যেই চিন্তিত হওয়ার কথা টুখেলের। মাত্র তিন দিনে এই অলটিটিউডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া অসম্ভব বলেই মানছেন তিনি। তবুও টুখেল লড়াকু মুডে। দেশের সব বাবা-মাকে অনুরোধ করেছেন, সোমবার সকালের খেলা দেখতে যেন ‘বাচ্চাদের স্কুল কামাইয়ের চিঠি’ লিখে দেয়া হয়!
