একজন উপাচার্য এবং একটি ক্যাফের গল্প

একজন উপাচার্য এবং একটি ক্যাফের গল্প

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় রূপান্তরের মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। বহু বছরের সুনাম একটিমাত্র সিদ্ধান্তে অনেক ক্ষেত্রে টালমাটাল হয়ে যায়। এমন সময়ে আস্থা হয়ে ওঠে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আর ক্ষমতার নৈকট্য যাকে প্রায়ই প্রকৃত কর্তৃত্ব বলে ভুল করা হয়। তা কোনো নেতার দৃষ্টিভঙ্গিকে আলোকিত করতে পারে। আবার অদৃশ্যভাবে ক্ষয়ও করতে পারে। প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্ব সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নতুন কিছু উদ্বেগ সামনে আসে। এগুলো সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বা নীতি নির্ধারককে ঘিরে নয়। বরং এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। যিনি একদিকে স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

অন্যদিকে একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। সহকর্মীদের একাংশের বর্ণনায়- তিনি নাকি জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ধারণাকে ব্যবহার করেছেন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে নয়, বরং ব্যক্তিগত মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। অস্বস্তি ছিল নীরব, কিন্তু স্থায়ী। করিডোরে ব্যক্তিগত আলোচনায় একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল- তিনি কি সত্যিই সংস্কারের চেতনাকে এগিয়ে নিচ্ছেন? নাকি সেই স্রোতে ভেসে নিজেই উপরে উঠছেন। একাধিক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও উচ্চপদস্থ প্রশাসকের দাবি, উপাচার্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা উল্লেখ করতেন। সহকর্মীদের মতে, তিনি এমনভাবে কথা বলতেন যেন বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে তার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। ঢাকার একটি অভিজাত ক্যাফেতে তিনি নিয়মিত বসতেন। অনেকেই আসতেন এই ক্যাফেতে। এ নিয়ে গণমাধ্যমের আগ্রহ বাড়লে তখন বৈঠকের স্থান অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ- এসব ক্যাফে বৈঠক ছিল ব্যক্তিগত সম্পদ বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য। ঢাকার অভিজাত এলাকা ও পূর্বাচলে উচ্চমূল্যে সম্পত্তি কেনার নানা গল্প তো চালু আছে। সমালোচকদের অভিযোগÑ কিছু ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার কথিত প্রভাব ছিল প্রচ্ছন্ন। সংস্কারের আবহকে কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছেন। সূত্রের দাবি, একটি ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে তহবিল বিতরণে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে বিভিন্ন সময়।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে ড. ইউনূস অবগত ছিলেন কিনা জানা যাচ্ছে না। তবে তার নাম ও সুনামের মধ্যে জড়িয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ জমা পড়েছে। উপাচার্য হিসেবে তার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ছিল এবং আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মতে, সাধারণত উপাচার্য নিয়োগে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয় তার অনেকটাই মানা হয়নি। ফলে এই নিয়োগকে অস্বাভাবিক বলা হচ্ছিল। প্রচলিত নিয়মে বিজ্ঞাপন, সংক্ষিপ্ত তালিকা, সাক্ষাৎকার, ট্রাস্টি বোর্ডের সুপারিশ এবং প্রেসিডেন্টের অনুমোদনÑসবমিলিয়ে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়। এটা ছিল ব্যতিক্রমী। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের মতে, বিষয়গুলো ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও সুশাসনের প্রশ্ন জড়িত। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব শুধু আইনগত প্রক্রিয়া মেনে নিলেই যথেষ্ট নয়, তা হতে হবে এমন যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের আস্থা অর্জন করে। এই ঘটনাপ্রবাহ আবারো স্মরণ করিয়ে দেয় সংস্কারের সময় নৈতিক নেতৃত্ব ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। নৈকট্যের আস্থা যদি দায়বদ্ধতার চেয়ে বড় হয়ে উঠে তবে সংস্কারের আলো ছায়ায় ঢেকে যেতে পারে।

উল্লিখিত উপাচার্য এক বছরেই নিজেকে ভ্রমণপ্রেমী বলে জাহির করেছেন। প্রতি মাসেই তিনি বিদেশ গেছেন। বারংবার সফরের ব্যয় এবং বাস্তব ফলাফল নিয়ে পরবর্তীতে ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু সদস্য প্রশ্ন তোলেন। বিদেশে থাকা অবস্থায় তিনি প্রতিদিন ৫০০ ডলার ভাতা নিতেন। এ নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডেও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অন্তত দুজন শিক্ষক জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। এই ব্যয়ের সঙ্গে পরিমাপযোগ্য একাডেমিক অর্জন কী। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হলো- ট্রাস্টি বোর্ডের আস্থা ধরে রাখায় তার সক্ষমতা। তিনি জানেন ক্ষমতার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয়। এক্ষেত্রে প্রফেসর ইউনূসকে তিনি ব্যবহার করেছেন নানা কৌশলে। নির্বাচনের সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে বেশি নজর রাখছিলেন এই উপাচার্য। যখন একটি বিশেষ দলের উত্থান ঘটবে এমন একটি ধারণার জন্ম হচ্ছিল তখন তিনি ক্যাম্পাসে নির্দিষ্ট কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। যারা কিনা বিশেষ দলের সঙ্গে মতাদর্শগতভাবে ঘনিষ্ঠ। এটা ছিল তার একটি কৌশল। তিনি বলে বেড়াতেন-তার শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বলে রাখা ভালো, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু বাংলাদেশে নয়, এর সুনাম আছে আঞ্চলিক পর্যায়েও। আর এই সুনাম রাতারাতি গড়ে উঠেনি। গড়ে উঠেছে দশকের পর দশক ধরে। এর পেছনে রয়েছে একাধিক কঠোরতা, শিক্ষকদের ভূমিকা এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাফল্য।


Gholam Mostafa

৩ মাস আগে

An excellent piece of journalism wherein connotation, nuance and investigative norms pleasantly met. Congratulations.
We'd love to see such stories in the Manab Zamin as a pathfinder of decent yet excellent journalism. Thank you the daily Manab Zamin.

মন্তব্য করুন