যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে একটি নাটকীয় দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একটি বড় জয় পেলেও তিনটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। এতে আদালত এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট সবসময় যা চান তা না-ও পেতে পারেন। ট্রাম্পকে তিনটি বড় পরাজয়ের সম্মুখীন হতে হয়েছে। প্রথমত, ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের গভর্নর লিসা কুক’কে অপসারণের ক্ষেত্রে আদালত ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
৫-৪ ভোটের এই সংকীর্ণ রায়ে দু’জন রক্ষণশীল বিচারক প্রধান বিচারক জন রবার্টস এবং ব্রেট কাভানা তিনজন উদারপন্থী বিচারকের সাথে যোগ দিয়ে লিসা কুককে অপসারণের চেষ্টা আটকে দেন। লিসা কুকের বিরুদ্ধে বন্ধকি জালিয়াতির অভিযোগ এনেছিলেন ট্রাম্প। তবে এর পেছনে সুদের হার না কমানোর কারণে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার ওপর ট্রাম্পের ক্ষোভ ছিল প্রধান কারণ। জন রবার্টস রায়ে সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্টরা যদি ফেডারেল রিজার্ভের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারেন তবে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। দ্বিতীয় পরাজয়টি আসে ডাকযোগের ব্যালট গণনার নিয়ম নিয়ে। নির্বাচনের দিন পোস্টমার্ক করা কিন্তু দেরিতে পৌঁছানো ব্যালট রাজ্যগুলো গণনা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্পের করা আপিলটি খারিজ হয়ে যায়। এই মামলায় উদারপন্থী বিচারকদের সাথে জন রবার্টস এবং ট্রাম্পের নিযুক্ত বিচারক অ্যামি কোনি ব্যারেট যোগ দেন। ব্যারেট সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রকাশ করে জানান, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় ও পদ্ধতি নির্ধারণের ব্যাপক ক্ষমতা রাজ্যগুলোর রয়েছে এবং ডাকযোগের ভোটে কারচুপির যে অভিযোগ ট্রাম্প করেছেন তা নাকচ করে দিয়ে এটিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমাধান করার কথা বলেন। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে একে সৎ নির্বাচনের জন্য ক্ষতিকর বলে আখ্যা দেন এবং কংগ্রেসের প্রতি তার নির্বাচনি সংস্কার বিল পাস করার আহ্বান জানান।
সবশেষে, ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল ই জেন ক্যারলের করা মানহানি মামলার আপিল সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক সরাসরি প্রত্যাখ্যান। ১৯৯০-এর দশকে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ড্রেসিংরুমে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন সাবেক ম্যাগাজিন লেখিকা ক্যারল। তিনি অভিযোগ করেন, ওই স্টোরে তাকে ধর্ষণ করেন ট্রাম্প। ২০২৩ সালের জুড়ি বোর্ডের রায় অনুযায়ী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ ডলারের যে দেওয়ানি জরিমানার রায় হয়েছিল, সুপ্রিম কোর্ট কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই তার পুনর্মূল্যায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তকে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন ও আইনি যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করে সামাজিক মাধ্যমে বলেন, তিনি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবেন। ক্যারলের অন্য একটি মামলায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের জরিমানার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আপিলের পরিকল্পনা থাকলেও, এই ৫০ লাখ ডলারের রায় বাতিলের সমস্ত চেষ্টা এখানেই সমাপ্ত হলো।
সুপ্রিম কোর্টের এই মেয়াদের শেষদিকের সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে বিচারকরা ট্রাম্পের পক্ষে একটি বড় রায় দেন, যা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছে। রায়টি ছিল স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা নিয়ে। আদালতের ছয়জন রক্ষণশীল বিচারকের মধ্যে কয়েকজন আকস্মিকভাবে তিনজন উদারপন্থী বিচারকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। প্রায় ১০০ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মতভাবে রায় দিয়েছিল যে, কংগ্রেস দ্বারা গঠিত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কমিশনারদের অপসারণ করার ক্ষেত্রে তৎকালীন ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের কোনো অবাধ ক্ষমতা থাকবে না। সোমবার ডনাল্ড ট্রাম্পের করা এক আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সেই দীর্ঘদিনের আইনি নজির বাতিল করে দেয়। প্রধান বিচারক জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত উল্লেখ করে বলেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহারকারী অধীনস্থরা তার দ্বারা অপসারণযোগ্য।
এই রায়ে আদালতের ছয়জন রক্ষণশীল বিচারকই ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেন, অন্যদিকে তিনজন উদারপন্থী বিচারক এর ভিন্নমত পোষণ করেন। এর ফলে ট্রাম্প এবং ভবিষ্যতের সমস্ত প্রেসিডেন্ট ফেডারেল ট্রেড কমিশনসহ ডজন খানেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানদের নিজেদের ইচ্ছামতো অপসারণ ও প্রতিস্থাপন করার ব্যাপক ক্ষমতা পেলেন। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নব্বই বছরের আইনি নজির সম্পূর্ণ এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে বাতিল করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে এমন এক সময়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে যখন এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল।
