সিলেট সেটেলমেন্ট

ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ৬২ মৌজার গেজেট

ফন্ট সাইজ:

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের একটি ভূমি জরিপ। সেটি হচ্ছে বিএস। গোটা দেশে এই জরিপ শেষ হওয়ার পথে থাকলেও সিলেটে শেষ হয়েও হচ্ছে না। দাগ বা খতিয়ানে মামলার অজুহাত দেখিয়ে এসব মৌজার চূড়ান্ত গেজেট ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আর এই সুযোগে সিলেট সেটেলমেন্টের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গোপনে শুনানি করে টাকার খেলায় মেতে উঠেছে। লুটে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। সূত্র বলছে, যেসব মৌজার ভূমির মূল্য বেশি এসব মৌজার চূড়ান্ত গেজেট এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এর মধ্যে সিলেট মিউনিসিপ্যালিটি সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌজা।

আইনজ্ঞরা বলছেন- মৌজার কোনো কোনো দাগ কিংবা খতিয়ানে আপত্তি, মামলা থাকতেই পারে। কিছুসংখ্যক দাগ কিংবা খতিয়ানের কারণে গোটা মৌজা আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো রেখে মৌজার গেজেট চূড়ান্ত করা যায়। ২০২৫ সালের ১৭ই জুলাই ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মাসিক সমন্বয় সভার সিলেট সেটেলমেন্ট জোনের দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সভায় উপস্থাপিত তথ্যে জানা যায়- সিলেট সেটেলমেন্ট জোনের ১০৯টি মৌজার রেকর্ডপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ওই বছরের জুন মাসে ২৩টি এবং জুলাই মাসে ১৮টি মৌজার রেকর্ড-পত্র হস্তান্তর সম্পন্ন হলেও অবশিষ্ট ৬৮টি মৌজার কার্যক্রম ঝুলে ছিল।

সভায় সিলেটের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছিলেন- ৩৬টি মৌজা রিট পিটিশনজনিত কারণে স্থগিত রয়েছে এবং বাকি ৩২টি মৌজার কার্যক্রম চলমান। যা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও অধিকাংশ মৌজার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এদিকে- ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয় সভার সিদ্ধান্তেও আটকে রাখা মৌজাগুলো নিয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সভায় নির্দেশ দেওয়া হয়- রিটের আরজি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায় যে, তা জরিপ কার্যক্রমকে সরাসরি প্রভাবিত করে না, তাহলে দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে চূড়ান্ত প্রকাশনা সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশের প্রস্তাব প্রেরণ করতে হবে।

এমনকি রিটভুক্ত খতিয়ান বাদ দিয়েও গেজেট প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু অধিদপ্তরের এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা বাস্তবে কার্যকর করা হয়নি। বহু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কয়েকটি খতিয়ান বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও পুরো মৌজার রেকর্ডপত্র আটকে রাখা হয়েছে। সিলেট সেটেলমেন্টের ভারপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার ও চার্জ অফিসার-১ সোনিয়া সুলতানা ২০২৫ সালের ১২ই আগস্ট ভূমিমালিকদের উদ্দেশ্যে অফিস আদেশ নম্বর ও স্বাক্ষরবিহীন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে সংশ্লিষ্ট মৌজাসমূহে ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৭ বিধির অধীন আবেদন গ্রহণে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার ঘোষণা প্রদান করেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে বিজ্ঞপ্তির বক্তব্যের সঙ্গে কার্যক্রমের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে সিলেট সদর উপজেলার আটগাঁও, বহর, কুমারগাঁও, কসবা আখালিয়া, বাগবাড়ী, সাদিপুর ২য় খণ্ড, দেবপুর ও টুলটিকর, গোলাপগঞ্জ উপজেলার হাতিমনগর উত্তর, বাঘা, গোলাপনগর, আমুড়া, রণকেলী, ফুলবাড়ী, হাজীপুর, দড়া, রায়গড়, দত্তরাইল, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ও নালিউরি, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার তৈমুরনগর, জুড়ী উপজেলার বাগমারা, আমবাড়ী, সালদিগা, বরথল, গাঙ্গকুল, দোহালিয়া, কালুগড়, সফরপুর, দক্ষিণভাগ, আথনীকান্দি, তেরাকুড়ি, চিন্তাপুর, গজভাগ, জুতিরবন্দ ও ফারুকবন্দ, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপার্টি, জগন্নাথপুর উপজেলার ইকরছই, দোয়ারাবাজার উপজেলার বালিজুড়ী, নৈনগাঁও ও বাজিতপুর এবং চুনারুঘাট উপজেলার পানছড়ি, উলুকান্দি, রাজ্জাকপুর, বড়াইল ও রুদ্রপুর মৌজাসমূহে বিবিধ মামলার শুনানি কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত হচ্ছে। মৌজাসমূহের পাশাপাশি সিলেট সদরের মিউনিসিপ্যালিটি, সাদিপুর ১ম খণ্ড, গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বর, কোম্পানীগঞ্জের কালাসাদক, কালাইরাগ, জীবনপুর ও রাজনগর, জকিগঞ্জের উত্তরভাগ, জগন্নাথপুরের করিমপুর কিসমত, গন্ধর্বপুর, মইজপুর, পাটলীচক ও দরিখঞ্জনপুরসহ আরও বহু মৌজার রেকর্ডপত্র রিট পিটিশনের অজুহাতে স্থগিত রাখা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর প্রকৃতি, আদেশের পরিধি এবং রেকর্ডপত্র আটকে রাখার আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে ভূমিমালিকদের কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রদান করা হচ্ছে না। ফলে সাধারণ ভূমিমালিক ও সেবাপ্রত্যাশীরা ন্যায়সঙ্গত প্রশাসনিক ও ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে- রিট পিটিশনের অজুহাত এবং এসএস ম্যানুয়াল, ১৯৩৫-এর ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৭ বিধিকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চমূল্যের মৌজাসমূহের কার্যক্রম ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুলিয়ে রেখে টাকার নেশায় মালিকানা পরিবর্তনও করছেন। ফলে সাধারণ মানুষ জমির নামজারি, খাজনা পরিশোধ, ক্রয়-বিক্রয়, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি হস্তান্তরসহ মৌলিক ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ব্যাপারে সিলেট সেটেলমেন্টের ভারপ্রাপ্ত সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মামলা থাকায় অনেক মৌজা চূড়ান্ত গেজেটের জন্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে এরই মধ্যে কয়েকটি মৌজা পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ৬০ থেকে ৬২টি মৌজার চূাড়ান্ত গেজেট বাকি রয়েছে। তিনি বলেন- আমরা কাজ চলমান রেখেছি। যে মৌজা নিয়ে আপত্তি নেই সেগুলো দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সিলেট জেলা বারের সাবেক জিপি ও সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট এরশাদুল হক মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মৌজার গেজেট না হওয়ার কারণে ভূমিমালিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক জায়গা আরএস শুরু হয়েছে। সেখানে স্বাধীনতাত্তোর সিলেটের প্রথম বিএস জরিপ শেষ করা হলো না। তিনি বলেন- মৌজার বিভিন্ন দাগ কিংবা খতিয়ানে মামলা থাকতে পারে। সেগুলো রেখেও চূড়ান্ত গেজেট করা যায়। এজন্য তিনি বর্তমান সরকারের ভূমিমন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন