চীনকে সামরিকভাবে প্রতিহত করার কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোট এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন। ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’ বলতে জাপান থেকে তাইওয়ান ও ফিলিপাইন হয়ে বোর্নিও পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বীপমালার ধারাবাহিকতাকে বোঝায়।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাপানে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের টাইফন মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রাখার প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে ওকিনাওয়ায় অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী নেভি-মেরিন এক্সপেডিশনারি শিপ ইন্টারডিকশন সিস্টেম অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র (নেমেসিস) এবং মেরিন এয়ার ডিফেন্স ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম (মেডিস) মোতায়েন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর ও তাইওয়ান ঘিরে চীনের সম্ভাব্য সামরিক অভিযান আরও জটিল হয়ে উঠবে। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, হামলা ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার সমন্বিত সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেইজিংকে এখন সেই ধরনের সামরিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে, যা এতদিন চীন তার ‘অ্যান্টি-অ্যাক্সেস/এরিয়া-ডিনায়াল (এ২/এডি)’ কৌশলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল।
অর্থাৎ, প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীকে দূরে রাখার যে কৌশল এতদিন চীন ব্যবহার করে এসেছে, এবার একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বেইজিংকেও। এর ফলে স্থলভিত্তিক প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চীনের পক্ষে থাকা সামরিক ভারসাম্য ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে শুরু করেছে টোকিও ও ওয়াশিংটন।
এই বৃহত্তর কৌশলগত পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো- আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে জাপানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ‘টাইফন’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংরক্ষণের পরিকল্পনা। যৌথ সামরিক মহড়া শেষে ঠিক কোন ঘাঁটিতে এই ব্যবস্থা রাখা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মহড়া শেষ হওয়ার পর অস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেয়ার দীর্ঘদিনের প্রচলিত নীতি থেকে সরে এসে জাপানেই সেগুলো সংরক্ষণের সিদ্ধান্তকে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টাইফন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা থেকে টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও এসএম-৬ বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা এবং এর সঙ্গে এনএমইএসআইএস অ্যান্টি-শিপ ও এমএডিআইএস আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জজুড়ে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে।
এই নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য হলো, ওই অঞ্চলে চীনের যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য নৌবাহিনীর জাহাজকে কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা এবং তাদের সামরিক তৎপরতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে মোতায়েন করা লঞ্চারের সংখ্যা এখনও চীনের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের তুলনায় অনেক কম। ফলে সামরিক ভারসাম্যের পরিবর্তন শুরু হলেও সেটি এখনো পুরোপুরি উল্টে যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকল্পনা সফল করতে আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও বড় মজুত প্রয়োজন হবে। তবে ওকিনাওয়াসহ জাপানের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিয়ে স্থানীয় জনগণের অসন্তোষ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এই মোতায়েন কতদিন স্থায়ী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
জাপান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক তেতসুও কোটানি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র আগে থেকেই মোতায়েন করলে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়তে পারে, তবে স্থানীয় মানুষের মধ্যে এ আশঙ্কাও বাড়বে যে ভবিষ্যৎ সংঘাতে তাদের এলাকাই প্রথম হামলার লক্ষ্য হতে পারে।
অন্যদিকে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান মাসলো বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।
শুধু জাপান নয়, ফিলিপাইনেও একই ধরনের কৌশল বাস্তবায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র।সাম্প্রতিক বালিকাতান যৌথ সামরিক মহড়ায় প্রথমবারের মতো ফিলিপাইনের মাটি থেকে স্থলভিত্তিক টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। একই মহড়ায় তাইওয়ান থেকে মাত্র ১৯০ কিলোমিটার দূরের বাতানেস দ্বীপপুঞ্জে নেমেসিস ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে সমুদ্রপথে শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানোর মহড়া চালায় মার্কিন মেরিন বাহিনী।
এছাড়া জাপানের স্থল আত্মরক্ষা বাহিনীও প্রথমবার বিদেশের মাটিতে টাইপ-৮৮ অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটি অবসরপ্রাপ্ত জাহাজে সফল হামলার মহড়া চালায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব মহড়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ফিলিপাইনের মধ্যে সামরিক সমন্বয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ ব্যবস্থা ও যৌথ অপারেশনাল পরিকল্পনা একীভূত হওয়ায় ‘ফার্স্ট আইল্যান্ড চেইন’-জুড়ে একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে চীনের নৌ-অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানে টাইফন মোতায়েনের পেছনে রয়েছে ১৯৮৭ সালের ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) চুক্তির অবসান।
ওই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করতে পারত না। তবে চীন কখনোই এই চুক্তির অংশ ছিল না। ফলে কয়েক দশক ধরে বেইজিং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রচলিত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে।
২০১৯ সালে আইএনএফ চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আবারও এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, জাপানে টাইফন মোতায়েন সেই নতুন যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি।
তবে সব বিশ্লেষক এই মোতায়েনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। তাদের মতে, স্থলভিত্তিক মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সহজেই আগাম হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পাশাপাশি জাপান ও ফিলিপাইনে এসব অস্ত্র ব্যবহারের রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামো এখনও সংবেদনশীল।
এর জবাবে চীন আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, সামরিক মহড়া এবং তথাকথিত ‘গ্রে-জোন’ তৎপরতা বাড়াতে পারে। ফলে প্রতিরোধক্ষমতার ভারসাম্য কিছুটা ফিরলেও ভুল হিসাব বা অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, জাপানে টাইফন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত কেবল একটি অস্ত্র রাখার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নয়; বরং এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের একটি নতুন যুগের সূচনা নির্দেশ করছে।
