ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাবেক কূটনীতিক এবং ভূরাজনীতি বিশ্লেষক শশী থারুর সম্প্রতি ‘ইরান যুদ্ধ: নয়াদিল্লির হার, নাকি পাকিস্তান সত্যিই লাভবান?’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানে
তিনি ইরান-ইসরাইল সংঘাত-পরবর্তী পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কীভাবে পড়ছে- তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন।
এই প্রবন্ধের বিশেষত্ব হলো, এটি কেবল যুদ্ধ বা কূটনৈতিক ঘটনার বিবরণ নয়; বরং এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি, প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা এবং মধ্যস্থতার ভূমিকা কীভাবে কাজ করে- তার একটি সমালোচনামূলক পাঠ।
নিচে থারুরের মূল পর্যবেক্ষণগুলো পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করে তার রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
‘মার্কিন সামরিক সাফল্য কৌশলগত বিজয়ে রূপ নেয়নি’
থারুরের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে সামরিকভাবে যেসব লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছে, তা আংশিকভাবে সফল হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত বিজয়ে পরিণত হয়নি। কারণ যুদ্ধের পর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে মৌলিক কোনো স্থায়ী পরিবর্তন ঘটেনি।
এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। অনেক সময় একটি পরাশক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে সুবিধা অর্জন করলেও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাক- এই তিনটি উদাহরণ দেখায় যে, সামরিক শক্তি সব সময় কৌশলগত আধিপত্য নিশ্চিত করতে পারে না।
থারুর এখানে একটি গভীর প্রশ্ন তুলেছেন- শক্তি প্রয়োগ কি সত্যিই স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান দিতে সক্ষম?
‘ইরান প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে’
থারুরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তীব্র সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়েনি। বরং তার প্রশাসনিক কাঠামো, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব অনেকাংশে অক্ষুণ্ন থেকেছে।
এখানে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সামনে আসে- রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা। আধুনিক রাষ্ট্র কেবল সামরিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং রাজনৈতিক কাঠামো, সামাজিক সংহতি এবং অভ্যন্তরীণ বৈধতার ওপর তার টিকে থাকা নির্ভর করে।
ইরানের উদাহরণ দেখায় যে, বহিরাগত চাপ সবসময় রাষ্ট্র ভেঙে দিতে পারে না, যদি অভ্যন্তরীণ কাঠামো যথেষ্ট দৃঢ় হয়।
‘পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরে পাকিস্তান কিছু দৃশ্যমানতা পেয়েছে’
থারুরের অভিমতে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তান পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরে কিছুটা দৃশ্যমানতা অর্জন করেছে। তবে তিনি এটিকে কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
এখানে ‘দৃশ্যমানতা’ এবং ‘ক্ষমতা’- এই দুই ধারণার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় কোনো রাষ্ট্র আলোচনায় বা সংকটকালে সামনে আসে, সক্রিয় ভূমিকা রাখে এবং মনোযোগ আকর্ষণ করে- অর্থাৎ দৃশ্যমান হয়। কিন্তু সেই দৃশ্যমানতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাঠামোগত ক্ষমতা বা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব-ক্ষমতায় রূপ নেয় না।
থারুর মূলত এই পার্থক্যটিই নির্দেশ করেছেন- এই অর্জন যদি ধারাবাহিক কৌশল, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ভূমিকার ওপর দাঁড়াতে না পারে, তবে তা সাময়িক দৃশ্যমানতায় সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যায় না। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সক্রিয়তা দেখিয়েছে, যা তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে- এটিও একটি বাস্তব ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি। এই উপস্থিতিকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা বাস্তবতার একাংশকে উপেক্ষা করার শামিল হবে।
‘ভারত তার কূটনৈতিক সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি’
থারুরের মতে, ভারত পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও, সেই অবস্থানকে সংকটকালে কার্যকর নেতৃত্বে রূপান্তর করতে পারেনি।
এখানে মূল ধারণা হলো কূটনৈতিক পুঁজি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান একটি রাষ্ট্রকে বিশেষ সুবিধা দেয়। কিন্তু সেই পুঁজি যদি সংকটের মুহূর্তে কাজে না লাগে, তবে তার বাস্তব রাজনৈতিক মূল্য কমে যায়।
থারুরের প্রশ্ন হলো- ভারত কি কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার রাষ্ট্র, নাকি সংকট সমাধানের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রও হতে পারে?
‘কূটনীতি শুধু শক্তি নয়; শান্তির রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করা’
থারুর স্পষ্টভাবে বলেন, কূটনীতি কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন নয়; বরং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বিরোধী পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করা হয়।
আধুনিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ‘মধ্যস্থতা’ এবং ‘আস্থা তৈরি’। যে রাষ্ট্র একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, সেই রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।
এই দৃষ্টিতে কূটনীতি কেবল প্রতিক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের কৌশল ও দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি সক্রিয় নেতৃত্বের ক্ষেত্র।
শশী থারুরের এই প্রবন্ধ কোনো একটি দেশের বিজয় বা পরাজয়ের ঘোষণা নয়। এটি আধুনিক ভূরাজনীতির একটি বাস্তবতাকে সামনে আনে- যেখানে সামরিক শক্তি, কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং মধ্যস্থতার ক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করে।
তার বক্তব্য আমাদের তিনটি শিক্ষা দেয়-
প্রথমত, সামরিক শক্তি সব সময় কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করে না।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা আধুনিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা যুদ্ধ জেতায় নয়, বরং শান্তি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতায়।
এই অর্থে থারুরের প্রবন্ধ (সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও) কেবল ভারত বা পাকিস্তানকে নিয়ে নয়; এটি পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কূটনীতির নতুন ভাষা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
faraiæ[email protected]
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
