জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরালিধর একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এই প্রতিবেদনে তিনি ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। ফলে তিনি তার আপসহীন আইনি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলেন। তার নেতৃত্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই বছরের সময়কালে ইসরাইল অন্তত ২০,১৭৯ জন শিশুকে হত্যা করেছে। এটি ফিলিস্তিনিদের মোট মৃত্যুর প্রায় ৩০ ভাগ। কমিশন ঘোষণা করেছে যে, ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং পদ্ধতিগত কর্মকাণ্ড গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে শামিল। প্রতিবেদনে ইসরাইলের আচরণের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি নাবালকদের লক্ষ্য করে স্নাইপারদের ব্যবহার এবং নিখুঁত ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
পাশাপাশি এমন অবরোধ তৈরি করা হয়েছিল যা ব্যাপক দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। মুরালিধরের প্যানেল গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে নবজাতক ও প্রসূতি সেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এর ফলে তাদের মতে সরাসরি ফিলিস্তিনিদের প্রজনন ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করা হয়েছে। তদন্তে পশ্চিম তীরে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং নির্বিচারে আটক করার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। যদিও ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিবেদনটিকে একটি জঘন্য প্রচারণামূলক রচনা এবং মানহানিকর প্রহসন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে কমিশন জোর দিয়ে বলেছে যে, প্রাপ্ত প্রমাণ ফিলিস্তিনি সমাজকে শিকড় থেকে ধ্বংস করার এক অনস্বীকার্য গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারতীয় আইনি পরিমণ্ডলের ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষকদের কাছে, একটি বৈশ্বিক সামরিক শক্তির সামনে মুরালিধরের এই অটল অবস্থান পুরোপুরি তার স্বভাবসুলভ। এটি সেই নাটকীয় ঘটনার গভীর প্রতিধ্বনি বহন করে, যা তাকে নরেন্দ্র মোদি প্রশাসনের অধীনে বিচারিক স্বাধীনতার বিতর্কটির রাতারাতি প্রতীকে পরিণত করেছিল।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে মারাত্মক সামপ্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন দিল্লি হাইকোর্টের তৎকালীন সিনিয়র বিচারপতি মুরালিধর আহতদের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তার বাসভবনে মধ্যরাতে এক বিশেষ শুনানির আয়োজন করেছিলেন। পরের দিন বিকালে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের জন্য শাসক দলের রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি দিল্লি পুলিশের তীব্র ভর্ৎসনা করেন। মুরালিধর সতর্ক করে বলেছিলেন, আমাদের চোখের সামনে এই শহরে আমরা আরেকটি ১৯৮৪ সালের পুনরাবৃত্তি হতে দিতে পারি না। তার তিরস্কারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, সরকার মধ্যরাতে এক অভূতপূর্ব বিজ্ঞপ্তি জারি করে মুরালিধরকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করে। এই সময়টি দেশব্যাপী ক্ষোভের জন্ম দেয়, যার ফলে দিল্লি হাইকোর্ট বার এসোসিয়েশন এক বিরল ধর্মঘট পালন করে। তারা এই বদলিকে একজন স্বাধীন বিচারপতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলে নিন্দা জানায়। নির্বাহী বিভাগের অসন্তোষের ছায়া তখনো রয়ে গিয়েছিল।
বৃহত্তর বেঞ্চে তার পদোন্নতির অনুমোদন আটকে রাখা হয়। তিনি সুপ্রিম কোর্টে না পৌঁছেই উড়িষ্যা হাইকোর্ট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে জেনেভা থেকে কাজ করা এই প্রবীণ বিচারক ক্ষমতার কাছে একজন অস্বস্তিকর সত্যবাদী হিসেবেই রয়ে গেছেন। এটি শুধু একটি গাজা প্রতিবেদন বিষয়ক দায়িত্ব নয়। এই কমিশনটি একটি চলমান তদন্তকারী সংস্থা, যা ২০২১ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ কর্তৃক গঠিত হয়েছে। এর কাজ হলো সংঘাত-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকার আইনের কথিত লঙ্ঘনের তদন্ত করা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিবেদন জমা দেয়া।
