স্বা ধীন রাষ্ট্র কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, মানচিত্র এবং পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি আত্মিক ভিত্তি থাকে, যাকে আমরা ‘জাতীয়তাবাদ’ বলি। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যার জন্ম হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, সেখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং একইসঙ্গে জটিল। আজকের একুশ শতকের বিশ্বায়নের
যুগে, যখন ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সীমানা ক্রমশ মুছে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি ‘জাতীয়তাবাদী সরকার’ কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে গভীর পর্যালোচনার সময় এসেছে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদকে বারবার ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো তা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, কখনো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে জাতীয়তাবাদের প্রকৃত অর্থ কী? একজন কৃষকের কাছে, একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছে কিংবা একজন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধার কাছে জাতীয়তাবাদ মানে হলো- নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অধিকার। আদর্শ জাতীয়তাবাদী সরকারের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক রূপরেখা কী হতে পারে তা নিয়ে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদের শিকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি ছিল ভাষা ও সংস্কৃতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন মূলত বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম স্ফূলিঙ্গ। এরপর ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ- এই প্রতিটি ধাপে বাঙালি তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে একতাবদ্ধ হয়েছিল। এই জাতীয়তাবাদের মূল কথা ছিল- ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আমরা সবাই বাঙালি।
পরবর্তীতে, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ নামক একটি নতুন ধারণার জন্ম হয়। এর মূলভিত্তি ছিল ভৌগোলিক সীমানা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয়। এই ধারণায় বিশ্বাসীরা মনে করেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের থেকে আমাদের একটি আলাদা পরিচয় থাকা জরুরি, যা আমাদের রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠবে।
একটি আদর্শ জাতীয়তাবাদী সরকারকে এই দুই ধারণার মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি না করে, একটি সমন্বয়বাদী পথ বের করতে হবে। এমন একটি পথ, যা মুক্তিযুদ্ধের অসামপ্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করবে, আবার রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পরিচয়কেও সুসংহত করবে।
বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বঙ্গোপসাগর ও এর তীরবর্তী এই বদ্বীপ। এই প্রেক্ষাপটে একটি জাতীয়তাবাদী সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে অত্যন্ত সুকৌশলী এবং মেরুদণ্ডসম্পন্ন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য হলেও একটি জাতীয়তাবাদী সরকার কেবল কৃতজ্ঞতার জালে আটকে থেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিসর্জন দিতে পারে না। সীমান্তে ফেলানীর মতো আর কোনো নাগরিকের মৃত্যু মেনে নেয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম অবমাননাকর। জাতীয়তাবাদী সরকারকে ভারতের সঙ্গে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সীমান্তহত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি তিস্তাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য অধিকার আদায় করা অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক নদী আইনের ভিত্তিতে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করে ভারতের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে।
চীনের বিপুল বিনিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও একটি জাতীয়তাবাদী সরকার কোনোভাবেই ‘ঋণফাঁদে’ পা দেবে না। মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা জাতীয়তাবাদী সরকারের অন্যতম প্রধান শর্ত হতে হবে। কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখে কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।
রপ্তানি বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্সের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানবাধিকার বা গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কোনো পরাশক্তি যদি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তবে জাতীয়তাবাদী সরকারকে তার শক্ত প্রতিবাদ করতে হবে। একইসঙ্গে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করে বিদেশিদের হস্তক্ষেপের সুযোগ ও অজুহাত চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
একটি দেশ রাজনৈতিকভাবে যতই স্বাধীন হোক না কেন, অর্থনৈতিকভাবে পরাধীন হলে তার সার্বভৌমত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বলতে বোঝায় দেশের সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশ।
আমদানি-নির্ভর এলএনজি এবং কয়লার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। জাতীয়তাবাদী সরকার নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ জোর দেবে। নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসার ঘটিয়ে এবং অসম কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো বাতিল বা সংশোধন করে জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
সার ও বীজের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কৃষকদের সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে, বিদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে দেশীয় মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে সুরক্ষা দিতে যৌক্তিক শুল্ক আরোপ করতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ ও আইটি খাতের রপ্তানি বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে।
জাতীয়তাবাদী সরকারের সবচেয়ে কঠোর অবস্থান হতে হবে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। দেশের মানুষের কষ্টার্জিত টাকা বিদেশে পাচার হওয়া জাতীয় স্বার্থের চরম পরিপন্থি। কঠোর আইন প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা একটি প্রকৃত দেশপ্রেমিক সরকারের প্রধান কাজ। পাশাপাশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রবাসে ও বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার একটি বড় দিক হলো সীমান্ত সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
রোহিঙ্গা সংকট বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিশাল হুমকি। একটি জাতীয়তাবাদী সরকারকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে, প্রয়োজনবোধে মিয়ানমারের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এটি কেবল মানবিক ইস্যু নয়, এটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান কঠোর হাতে দমন করতে হবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোকে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত করতে হবে, যাতে দেশের এক ইঞ্চি মাটিও অরক্ষিত না থাকে।
একটি জাতির পরিচয় কেবল তার অর্থনীতি বা সামরিক শক্তিতে নয়, তার সংস্কৃতিতে নিহিত থাকে। বিশ্বায়নের যুগে আকাশ সংস্কৃতি এবং ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহের কারণে নিজস্ব সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে।
সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে বাংলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া একটি জাতীয়তাবাদী সরকারের দায়িত্ব। দলীয় স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা জাতীয় নেতাদের অবদানকে বিকৃত করার অপচেষ্টা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস তুলে ধরতে হবে। ভিনদেশি অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ থেকে যুবসমাজকে বের করে আনতে দেশীয় চলচ্চিত্র, সাহিত্য, শিল্পকলা ও খেলাধুলায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর তীব্র মেরূকরণ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একে অপরকে দেশদ্রোহী আখ্যা দেয়ার যে প্রবণতা, তা জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে বড় বাধা।
একটি জাতীয়তাবাদী সরকারকে অবশ্যই ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ’ চর্চা করতে হবে। জাতীয়তাবাদ যেন উগ্রতায় রূপ না নেয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, কিংবা পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী- সবাই এই দেশের সমান নাগরিক। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার ও ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া প্রকৃত জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পাশাপাশি, সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করা একটি গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আধুনিক যুগে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা কেবল জল, স্থল আর আকাশসীমায় আটকে নেই; এটি এখন সাইবার স্পেসেও বিস্তৃত। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য যেন বিদেশি বহুজাতিক কোম্পানি বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের সার্ভারে অরক্ষিত না থাকে, তার জন্য নিজস্ব ডেটা সেন্টার তৈরি এবং কঠোর ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ব্যাংকিং খাত এবং সামরিক তথ্যভাণ্ডারকে সাইবার আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘সাইবার ডিফেন্স কাঠামো’ গড়ে তোলা বর্তমান সময়ের অন্যতম প্রধান দাবি।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি জাতীয়তাবাদী সরকার কোনো কল্পকথার বিষয় নয়, এটি একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক দর্শন। এই দর্শন অন্ধ আবেগ, ভারত-বিরোধিতা বা পাকিস্তান-প্রীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হবে আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।
যে সরকার কৃষকের ঘামের মূল্য বুঝবে, যে সরকার আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে মাথানত করবে না, যে সরকার দেশের সম্পদ লুটকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে এবং যে সরকার পাহাড় থেকে সমতল- সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে, সেই সরকারই হবে প্রকৃত জাতীয়তাবাদী সরকার। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বিদেশের মুখাপেক্ষী না হয়ে, লাল-সবুজের পতাকাকে বুকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে দাঁড়ানোই হতে পারে আমাদের আগামীর জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তি।
লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ধনুঁঁনরবৎ৪০০১@মসধরষ.পড়স
