৫৭ বছর বয়সী নাজিব বাতাইনেহ। কাতারের বিপক্ষে কানাডার জয়ের পর আবেগের বশে বলে ফেলেন, ‘কানাডাই এবার বিশ্বকাপ জিতবে। আমার সন্দেহ নেই।’ প্রথম জয়েই আবেগ এমন বাধাহীন। তাহলে প্রথমবার নকআউটে ওঠার পর কানাডাজুড়ে চিত্রটা কেমন ছিল, কল্পনা করুন। অথবা সেই ব্যক্তির কথা ভাবুন, দক্ষিণ আফ্রিকা নকআউটে কোয়ালিফাই করার পর ভোরবেলায় বিজয় মিছিলে যোগ দিতে যিনি পাজামা পরেই নেমে পড়েছিলেন রাস্তায়। টরন্টো থেকে জোহানেসবার্গ- উচ্ছ্বাসের ছবিটা ছিল একই রকম। কিন্তু ফুটবল সব স্বপ্ন একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখে না।
লস অ্যাঞ্জেলেসে আজ রাত ১টায় শেষ ৩২ রাউন্ডে মুখোমুখি হচ্ছে কানাডা-দক্ষিণ আফ্রিকা। তাই একজনের উৎসব চলবে, অন্যজনের ঐতিহাসিক যাত্রা থামবে বিদায়ের বেদনায়। কানাডার বিশ্বকাপযাত্রা ছিল রোমাঞ্চে
ভরা। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ড্র, কাতারের বিপক্ষে ৬-০ গোলের দাপুটে জয়, এরপর সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরেও নকআউটে যায় স্বাগতিকরা। কিন্তু শেষ ম্যাচের সেই পরাজয় শুধু গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগই কেড়ে নেয়নি, ঘরের মাঠে নকআউট খেলার স্বপ্নও ভেস্তে দিয়েছে। ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেসে রাউন্ড অব ৩২ (এবং সম্ভাব্য শেষ ষোলো) খেলার সুযোগ হারিয়ে এখন লস অ্যাঞ্জেলেসেই লিখতে হবে তাদের নতুন অধ্যায়। আক্ষেপ লুকাননি কানাডার কোচ জেসি মার্শ। তিনি বলেন, ‘আমরা খুব করে চেয়েছিলাম এখানেই থাকতে।
দলকে ঘিরে এবং সারা দেশে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, সেটিকে আরও এগিয়ে নিতে চেয়েছিলাম।’ তবে
হতাশার মাঝেও আশা হারাননি তিনি। তার বিশ্বাস, ভ্যাঙ্কুভারে না হলেও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকেই পুরো কানাডাকে নতুন করে উজ্জীবিত করার সুযোগ তাদের সামনে। মার্শের কথার প্রতিফলন কানাডার রাস্তাঘাটেও। টরন্টোজুড়ে এখন ‘ম্যাপল লিফ’ আকৃতির লাল ‘কানাডিয়ান ক্ল্যাপার’ সমর্থকদের নতুন উন্মাদনার প্রতীক। ফিফা ফ্যান ফেস্টিভালে বিনা মূল্যে বিতরণ করা এই ক্ল্যাপারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। টরন্টো বিশ্বকাপের নির্বাহী পরিচালক শ্যারন বোলেনবাখের ভাষায়, কানাডার প্রথম নকআউটে ওঠার আনন্দ এবং সহ-আয়োজক হিসেবে জাতীয় গর্ব- দুটোরই প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার গল্পটা যেন আরও বেশি সংগ্রামের।
উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর কাছে হারের পর চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে চার পয়েন্ট তুলে প্রথমবারের মতো নকআউটে জায়গা করে নেয় ‘বাফানা বাফানা’রা। এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ড্রেসিংরুমের ঐক্যকেই দেখছেন স্ট্রাইকার ইক্রাম রেইনার্স। তার ভাষায়, ‘কে খেলছে, সেটা বড় বিষয় নয়। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করছে, আমরা সবাই একসঙ্গে লড়ছি। সঠিক মানসিকতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে।’ একই সঙ্গে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। এবার আমাদের লক্ষ্য কানাডা। তাদের বিপক্ষেও আমরা শেষ পর্যন্ত লড়বো।’ দক্ষিণ আফ্রিকার মানসিক দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে মিডফিল্ডার স্পেফেলো সিথোলের কণ্ঠেও। তার মতে, ‘এই টুর্নামেন্টে দল যে লড়াকু মানসিকতা দেখিয়েছে, সেটিই দক্ষিণ আফ্রিকার প্রকৃত পরিচয়।’ দেশটির বিশ্লেষক লুঙ্গানি জামা লিখেছেন, ‘পুরো দক্ষিণ আফ্রিকা এখন অপেক্ষা করছে, বাফানা বাফানা যেন দেশবাসীকে আরও একবার আনন্দের উপলক্ষ এনে দেয়।’ তবে নকআউটের আগে প্রস্তুতিতে কিছুটা অসন্তুষ্ট দক্ষিণ আফ্রিকা।
গ্রুপ পর্ব শেষে সরাসরি লস অ্যাঞ্জেলেসে যাওয়ার বদলে তাদের আগে পচুকায় ফিরে, সেখান থেকে আবার ম্যাচ ভেন্যুতে উড়ে যেতে হয়েছে। কোচ হুগো ব্রুস ব্যাপারটা কিছুটা বিরক্তিকর বলে মন্তব্য করলেও অজুহাত বানাতে চাননি। তার বিশ্বাস, নকআউটে সফল হতে হলে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হয়। কৌশলগত দিক থেকে ম্যাচটি হতে পারে দারুণ উপভোগ্য। কানাডা বলের দখল, হাই প্রেসিং এবং জোনাথন ডেভিডের ফিনিশিংয়ের ওপর ভর করে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে।
বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকার ভরসা থাকবে জমাট রক্ষণ, দ্রুত ট্রানজিশন এবং দলীয় পারফরম্যান্স। কানাডার ছোটখাটো ভুলও ক্ষমা করবে না বাফানা বাফানারা। ২০০৭ সালে কানাডার বিপক্ষে একমাত্র দেখায় আফ্রিকান দলটি জিতেছিল ২-০ গোলে। ওই জয় হতে পারে বড় প্রেরণা। মাঠের লড়াইয়ে কানাডার সবচেয়ে বড় ভরসা জোনাথন ডেভিড। গ্রুপ পর্বে তার ধারাবাহিক গোল করার ক্ষমতাই দলকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। আর কোচ মার্শ জানিয়েছেন, অধিনায়ক আলফন্সো ডেভিস দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাঠে নামতে প্রস্তুত। ডেভিসের ফেরা নিঃসন্দেহে উদ্দীপ্ত করবে কানাডিয়ানদের।
