ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত সম্পদ ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দরকার। পাচার হওয়া অর্থের ওপর আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইউসিবি প্রথম ব্যাংক হিসেবে বাস্তব অগ্রগতি দেখিয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আমরা কোনো ধরনের আপস করবো না। সম্প্রতি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি-এর ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে এক সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান শরীফ জহীর।
ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন নিয়ে শরীফ জহীর বলেন, ৪৩ বছর পূর্ণ করা শুধু একটি অর্জন নয়, এটি মানুষের আমাদের প্রতি গভীর আস্থার প্রতীক। আমরা একটি প্রচলিত ব্যাংক থেকে সুশাসনভিত্তিক, আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছি। তবে ব্যাংকিং খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে আমাদের লক্ষ্য হলো- শেয়ারহোল্ডারদের ভালো মুনাফা দেয়া, গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়ানো, সেবার মান উন্নত করা, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নেতৃত্ব দেয়া এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ইউসিবিকে দেশের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর মধ্যে নিয়ে যাওয়া। আগামী দশ বছরে আমরা শুধু ব্যাংকের আকার বাড়াতে চাই না, বরং এর মান ও উৎকর্ষ আরও উন্নত করতে চাই। আমরা চাই, গ্রাহকসেবা ও নৈতিক ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ইউসিবি পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হোক। প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের বিশ্বাসই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়াও কার্যকর ও টেকসই করতে হবে। বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ও শেয়ার বাজেয়াপ্ত করা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ আর্থিক আদালত গঠন এবং একটি কেন্দ্রীয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে সরকারের ধারাবাহিক ও শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। আর্থিক লুটপাটকারী ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে চলমান ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। দ্রুত বিচার বা বিশেষ আর্থিক আদালতের মাধ্যমে এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে যে আর্থিক অপরাধ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
ব্যাংকিং খাতের সংকট নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের মূলধন সংকটে রয়েছে। মূলধনের পর্যাপ্ততা অনেক চাপের মধ্যে আছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণ সুবিধা কমে যেতে পারে এবং আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেয়া। এর ফলে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন (গ্রিন ফাইন্যান্সিং), ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত এসএমই প্রবৃদ্ধির মধ্যে বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ যখন উচ্চ-আয়ের দেশের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ব্যাংকগুলোকে শুধু সাধারণ লেনদেনের অর্থায়নে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের এই বৃহৎ রূপান্তরের অর্থায়নে এগিয়ে আসতে হবে। ইউসিবি’র লক্ষ্য হলো এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হওয়া। এ ছাড়া ‘ইউসিবি ইসলামিক’ দেশের অন্যতম বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং প্ল্যাটফরম হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।
ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময়েও ইউসিবি আমানত বৃদ্ধি এবং নতুন গ্রাহক অর্জনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এটি আমাদের ব্র্যান্ডের শক্তি এবং মানুষের আস্থারই প্রতিফলন। আমরা প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তে সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
শরীফ জহীর বাংলাদেশ ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিবিএ)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপ লিমিটেডের চেয়ারম্যান। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন ইনভেস্টরস এসোসিয়েশন (বেজিয়া)-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে শিল্প উন্নয়নে কাজ করছেন। এর আগে তিনি বিজিএমইএ’র পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
