প্রতারক থেকে সেবায়েত একজন হরিদাস পাল...

ফন্ট সাইজ:

হরিদাস পালের পুরো নাম শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলাধীন বালিয়ান ইউনিয়নের বালাশ্বর গ্রামে মো. রফিকুল ইসলাম এর কন্যা মো. স্মৃতি আক্তার এর সঙ্গে ২০১৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তাওহিদ ইসলাম নাম ধারণ করে। প্রতারণা করে সে একাধিক বিয়ে করেছে, রয়েছে তার দু’টি সন্তানও।

হরিদাস ২০১৯ সালে শ্বশুরের পরিচয়ে ফুলবাড়ীয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক নামে রিসোর্ট খোলেন। প্রতারণার কারণে র?্যাব’র হাতে ২০২২ সালে গ্রেপ্তারের পর রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতারণার নানান ঘটনা...

হরিদাস ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াকালীন অবৈধভাবে ভারতে যায় এবং সেখানকার পঞ্চায়েত প্রধানের কাছ থেকে এতিম এর সনদ নেয়। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার একটি ছবি এডিট করে তার ফেসবুক ওয়ালপেপারে রাখে। এরপর শেখ পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ এবং অর্থশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কাজ পাইয়ে দেয়া ও চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে বিপুল টাকা হাতিয়ে নেয়।

২০২২ সালে সে শেখ রেহানার প্রোটোকল অফিসার হিসেবে ভুয়া সিল দিয়ে একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার পদে থাকা ইমরান মেহেদী নামে একজনকে আগের পদে বহালের সুপারিশ করে। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় নভেম্বর ২০২২ মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীর বনানী এলাকা হতে তাকে আটক করে। আটককালে শেখ রেহানার প্রটোকল অফিসার পরিচয়ে ধর্মান্তরিত নাম তাওহিদ নামে তার কাছ থেকে ভুয়া ভিজিটিং কার্ড ও সিল পাওয়া যায়। তার বিরুদ্ধে শেখ রেহানার প্রোটোকল অফিসার পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে।
২০১৯ সালে ফুলবাড়ীয়া এলাকায় প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক নামে রিসোর্ট খোলার পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিট করা ছবি দেখিয়ে তার প্রজেক্টসহ অন্যান্য প্রজেক্টে অর্থলগ্নী করতে উৎসাহিত করে প্রতারণার মাধ্যমে রশিদ ছাড়া প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেয়।

ইলেকট্রিশিয়ান পরিচয়ে বড় বড় প্রতারণা...

হরিদাস ছোটকালে অবৈধভাবে ভারতে যাওয়ার পর সেখানে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ শিখে। ২০১০ সালে বাংলাদেশে ফিরে সে ঢাকা উত্তরায় মূলত পুরাতন এসি মেকানিক হিসেবে কাজ শুরু করে এবং বিভিন্ন সময় সবজি বিক্রেতা হিসেবেও কাজ করে। একপর্যায়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ নেয়। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে এবং নিজেকে শেখ হাসিনা পরিবারের ভুয়া প্রটোকল অফিসার হিসেবে জাহির করে বড় বড় প্রতারণা চক্র গড়ে তোলে। এ ছাড়া প্রতারণার মাধ্যমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেড় লক্ষ লোকের খাবার সাপ্লাইয়ের ঠিকাদারির কাজ নেয়।

প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জন...

বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে বড় বড় উন্নয়নমূলক প্রকল্পের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস, টেন্ডারে অংশগ্রহণকারীদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বড় অঙ্কের কমিশন বা অগ্রিম অর্থ নিতো। বিত্তশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে. নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করে বিভিন্ন কাল্পনিক প্রজেক্ট বা ব্যবসায়িক প্রকল্পে অংশীদার করার এবং বিপুল লভ্যাংশ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। তার ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক একাউন্ট নম্বর: ১৫৬১৫৭০০০৪৩৯০ আনুমানিক ৬৬ লাখ টাকা, ১৫৬১৫৭০০৩৬৩৪২ (ময়মনসিংহ শাখা) একাউন্টে আনুমানিক ২ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং ৩২১১৫৯০০০০৫৪০ (রবীন্দ্র সরণি, ঢাকা শাখা) একাউন্টে আনুমানিক ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং সিটি ব্যাংক একাউন্ট নম্বর: ২৩০৪৭১৮৪০২০০১-এ আনুমানিক ৩ লাখ টাকার অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তার বিকাশ নম্বর (০১৭১৩৮৮০২২৪) এ বিভিন্ন সময় অনেক টাকা লেনদেন হয়েছে। এছাড়া সে অবৈধভাবে স্বর্ণের বার কেনাবেচা এবং স্বর্ণ চোরাচালানের মতো অপরাধমূলক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে লোক মুখে শোনা যায়।

অবৈধ আয়ের টাকা দিয়ে পলাশবাড়ীতে রাম মন্দির নির্মাণ...​

এই অবৈধ টাকায় সে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট রিসোর্ট’-নামে একটি বিশাল বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলে এবং নামে-বেনামে প্রচুর জমি কেনে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল এক মন্দির কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করে, যার টাকার উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুরে (বৃন্দাবনপাড়া) গ্রামে অবস্থিত মধ্য রামচন্দ্রপুর কালী মন্দির এর নাম পরিবর্তন করত: শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ কালী মন্দির নামে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করে। মন্দিরটি ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরত্বে একটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত।

সমপ্রতি উক্ত স্থানে ৮১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাম বিগ্রহ নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসে। গত ১০ই ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ হতে রামের মূর্তির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মূর্তিটি ২০ী১০ বর্গফুট আয়তনের ৫ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট বেদির উপর স্থাপন করা হয়েছে। মূর্তিটি তৈরিতে লোহা ও কনক্রিট ব্যবহার করা হচ্ছে। রামের মূর্তি নির্মাণের জন্য রংপুরের ঠিকাদার বিধান চন্দ্র মহন্তর সঙ্গে মন্দির কমিটির ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়।

প্রতারক থেকে বিশ্বের বড় রাম মন্দিরের সেবায়েত...
হরিদাসের বহুমুখী সম্পৃক্ততা (ভারতে গমন ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা, ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাবার সরবরাহের সাব-ঠিকাদারি, ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, শেখ রেহানার প্রোটোকল অফিসার পরিচয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও অর্থ উপার্জন, বিনোদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সর্বশেষ ৫১ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি স্থাপন ও বিশ্বের সর্বোচ্চ ৮১ ফুট উচ্চতার রাম বিগ্রহ বা মূর্তি স্থাপনের উদ্যোগ) একজন ব্যক্তির ৪৪ বছরের জীবনের জন্য প্রায় অসম্ভব ও পারিপার্শ্বিকতা বিচারে সামঞ্জস্যহীন।

প্রতারক থেকে বড় ধর্মগুরু বনে যাওয়া...
হরিদাস একজন বড় মানের প্রতারক যা সাধারণ মানুষের জানা খুবই জরুরি। তিনি ধর্মের নামে ব্যবসা করে নিজে কোটিপতি বনে গেছেন। সাধারণ সনাতনীদের ধর্মীয় আবেগ কাজে লাগিয়ে বিশাল মন্দির গড়ে তোলা, মন্দিরের দান-দক্ষিণার টাকা আত্মসাৎ ও মন্দির এর আশপাশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে নানাবিধ ব্যবসা-বাণিজ্য করে নিজের আখের গোছাচ্ছে। মন্দির চত্বরে তার বিলাসবহুল বাড়ি এরই জ্বলন্ত উদাহরণ। এছাড়া সনাতনীদের অনেকেই বলছে রামমূর্তি মন্দিরের ভিতরে স্থাপন না করে বাহিরে স্থাপন করে তিনি ভগবান রামকেই অপমান করেছেন।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন