এক সময় পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ বালুচর বছরের বেশির ভাগ সময় অনাবাদি পড়ে থাকতো। এখন সেই চর চীনাবাদামের সবুজ গাছে ভরপুর। স্বল্প খরচে অধিক ফলন, সহজ পরিচর্যা ও বাজারে লাভজনক দাম পাওয়ায় নাটোরের লালপুর উপজেলার চরাঞ্চলে চীনাবাদাম হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার নতুন প্রতীক। এতে শুধু কৃষকের আয়ই বাড়ছে না, বদলে যাচ্ছে চরাঞ্চলের অর্থনীতি। চীনাবাদাম সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ একটি খাদ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পুষ্টিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুজ জাহের মানবজমিনকে জানান, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরে শক্তি জোগাতে চীনাবাদাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষের জন্য এটি একটি আদর্শ পুষ্টিকর খাদ্য। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, ঈশ্বরদী, লালপুর সদর ও বিলমাড়ীয়া ইউনিয়নের পাঁচটি কৃষি ব্লকের প্রায় ৩ হাজার ৭৫৪ হেক্টর চরাঞ্চলের মধ্যে চলতি মৌসুমে ৪৬৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের চীনাবাদামের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বারি চীনাবাদাম-৮ ও ৯, ঢাকা চীনাবাদাম-১ এবং বিনা চীনাবাদাম-৮ উল্লেখযোগ্য। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১ টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সরজমিন তিলোকপুর, নিমতলী, গৌরীপুর, চর জাজিরা, বিলমাড়ীয়া ও নওশারা চরে গিয়ে দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত বিস্তৃত চীনাবাদামের ক্ষেত। মৌসুমের শেষভাগে মাঠ জুড়ে চলছে চীনাবাদাম উত্তোলনের ব্যস্ততা। কৃষকরা কোথাও জমি থেকে বাদাম তুলছেন, কোথাও আবার গাছ থেকে বাদাম আলাদা করে শুকানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের কৃষক মনজুর হোসেন (৩২) বলেন, পাঁচ বিঘা জমিতে চীনাবাদাম চাষে তার প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
ফলন ভালো হওয়ায় বাজারমূল্য অনুকূলে থাকলে প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকার বাদাম বিক্রির আশা করছেন তিনি। মোহরকয়া গ্রামের কৃষক আব্বাস উদ্দিন (৪৮) জানান, পদ্মার বালুচরে চীনাবাদামের ফলন অন্য অনেক ফসলের তুলনায় ভালো হয়। বাদাম চাষে সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও কম। পাশাপাশি পাইকাররা সরাসরি মাঠ থেকে বাদাম কেনায় পরিবহন ঝামেলা ও অতিরিক্ত খরচের মুখোমুখি হতে হয় না। তার জমিতে প্রতি বিঘায় ১৩ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত ফলন হয়েছে। বাদাম ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, আমরা প্রতি মণ চীনাবাদাম ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায় ক্রয় করছি। আশাকরি সামনে দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় মানবজমিনকে বলেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের চীনাবাদাম চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদন সন্তোষজনক হওয়ায় আগামী বছর চরাঞ্চলে এ ফসলের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ।
