ভাইকিং দুর্গ ভেঙে ‘বিপ্লব’ দেম্বেলের

ভাইকিং দুর্গ ভেঙে ‘বিপ্লব’ দেম্বেলের

ফন্ট সাইজ:

এবারের আগে বিশ্বকাপে গোল ছিল না উসমান দেম্বেলের। দুই বিশ্বকাপ মিলে এক ডজন ম্যাচ খেলে গোলের খাতা খুলতে পারেননি। ব্যালন ডি’অর জয়ী দেম্বেলের জন্য এ রেকর্ড যে বড্ড বেমানান। সেই আক্ষেপ অবশ্য কাটান ইরাকের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে বিশ্বকাপে প্রথমবার গোলের দেখা পান ২৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। হালান্দবিহীন নরওয়ের বিপক্ষে করলেন হ্যাটট্রিক। সেটি আবার বিশ্বকাপে দ্বিতীয় দ্রুততম। শুক্রবার নরওয়েকে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারায় ফ্রান্স। তিন ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘আই’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন তারা। ১৯৯৮ সালের পর এ প্রথম গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জিতেছে ফ্রান্স। হেরেও ৬ পয়েন্ট নিয়ে নকআউটে নরওয়ে।

‘সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হতে পারে’- পাঁচ বছর আগে উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে এমন কথা বলেছিলেন সেই সময়ে বার্সেলোনার কোচ জাভি হার্নান্দেজ। আর বোস্টনে নতুন অধ্যায় লিখলেন দেম্বেলে। ম্যাচের ৭ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পের পাস থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে পান ম্যাচের প্রথম গোল। ১৬ মিনিটে পাল্টা আক্রমণ থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন তিনি। এরপর ৩২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে দারুণ কার্লিং শটে পূর্ণ করেন হ্যাটট্রিক। মাঝখানে ২৪ মিনিটে থেলো আসগার্ড নরওয়ের হয়ে একটি গোল শোধ দিলেও ফ্রান্সের দাপট কমাতে পারেনি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক এটি। শীর্ষে থাকা অস্ট্রিয়ার এরিখ প্রবস্ট ১৯৫৪ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে মাত্র ২৪ মিনিটে হ্যাটট্রিক করেছিলেন।

তাছাড়া বিশ্বকাপে প্রথম ফরাসি খেলোয়াড় হিসেবে প্রথম ২০ মিনিটে দুটি গোল পেলেন দেম্বেলে। চলতি বিশ্বকাপে ব্রায়ান ব্রোবি সুইডেনের বিপক্ষে একই কীর্তি গড়েন। ফ্রান্সের তৃতীয় ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করলেন দেম্বেলে। এর আগে জাস্ট ফন্টেইন ও কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপে ফরাসিদের হয়ে হ্যাটট্রিক করেন। এবারের বিশ্বকাপে কানাডার জোনাথন ডেভিড ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির পর তৃতীয় হ্যাটট্রিক এটি। ম্যাচের আগে দেম্বেলেকে নিয়ে তেমন আলোচনা ছিল না। আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর বিশ্রামে থাকা আর্লিং ব্রুট হালান্দ। তাদের ছাপিয়ে আলো কেড়ে নিলেন দেম্বেলে। যোগ দিয়েছেন গোল্ডেন বুট জেতার রেসে। যে তালিকায় ২ ম্যাচে ৫ গোল করা মেসি শীর্ষে। এমবাপ্পে ৪ গোলের পাশাপাশি দুটি গোলে সহায়তা করেছেন। ১ অ্যাসিস্ট ও এমবাপ্পের সমান ৪ গোল নিয়ে তিনে দেম্বেলে। সমান সংখ্যক গোল আছে ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও নরওয়ের আর্লিং ব্রুট হালান্দের।

ফ্রান্সের উত্তরে সিন নদীর তীরে ছোট্ট এক শহর ভার্ননে দেম্বেলের জন্ম। বাবা মৌসা দেম্বেলে মালি থেকে আসা অভিবাসী। মা ফাতুমাতা গিনি বংশোদ্ভূত। দুটি আফ্রিকান সংস্কৃতির বন্ধনে গড়া দেম্বেলের পরিবার। অভাব ছিল, কিন্তু স্বপ্নের কমতি ছিল না। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি দেম্বেলের টান ছিল অদম্য। ভার্ননের রাস্তায়, পাড়ার মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল নিয়ে পড়ে থাকতেন। পায়ের কাজ ছিল অবিশ্বাস্য। গতি, ড্রিবলিং, বাঁ ও ডান- দুই পায়ে সমান দক্ষ। আট বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব ইউএস ভার্ননে ফুটবলের হাতেখড়ি। দেম্বেলের প্রতিভা কোচদের চোখ এড়ায়নি। বয়সের তুলনায় দেম্বেলের খেলার পরিপক্বতা ছিল অনেক। ১০ বছর বয়সে ফ্রান্সের বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসেন। ২০০৮ সালে যোগ দেন রেনসের একাডেমিতে।

নর্মান্দি থেকে ব্রিটানিতে যাত্রা সহজ ছিল না। পরিবার থেকে দূরে, নতুন শহরে মানিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু মাঠে নামলেই সব ভুলে যেতেন তিনি। ২০১৫ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রেনসের মূল দলে অভিষেক হয় দেম্বেলের। ২০১৬ সালে জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন ১৫ মিলিয়ন ইউরোতে। বুন্ডেসলিগায় দেম্বেলে নিজেকে চেনালেন নতুনভাবে। এক মৌসুমে ৩২ ম্যাচে ১০ গোল ও ২১ অ্যাসিস্ট করেন তিনি। ডর্টমুন্ডে থাকার সময়ই বার্সেলোনার নজরে আসেন দেম্বেলে। ২০১৭ সালে নেইমার পিএসজিতে চলে যাওয়ার পর বার্সেলোনা মরিয়া হয়ে তার বিকল্প খুঁজছিল। সেই শূন্যতা পূরণে ১৩৫.৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে দেম্বেলেকে দলে নেয় কাতালান ক্লাবটি। দেম্বেলে রাতারাতি হয়ে যান বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দামি ফুটবলার। বার্সেলোনায় আসার পর শুরু হয় দেম্বেলের কঠিন অধ্যায়। একের পর এক চোটে ছয় বছরে ৭৮৪ দিন মাঠের বাইরে ছিলেন। মাঠের বাইরের জীবনও ছিল এলোমেলো।

রাত জেগে ভিডিও গেমস খেলা, অনুশীলনে দেরিতে আসা, খাদ্যাভাসে উদাসীনতা- সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ক্লাবের সবচেয়ে বেশি জরিমানা গোনা খেলোয়াড়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মরক্কোতে প্রেমিকা রিমাকে বিয়ে করেন দেম্বেলে।
বাবা হওয়ার পর জীবনটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন।। ঘরে ফিজিওথেরাপিস্ট রাখেন, পুষ্টিবিদ নিয়োগ দেন। রাত জাগার অভ্যাস ছেড়ে সময়মতো অনুশীলনে আসা শুরু করেন। ২০২৩ সালে পিএসজিতে যোগ দেয়ার পর দেম্বেলের ক্যারিয়ার পায় নতুন মাত্রা। এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার পর কোচ লুইস এনরিকের তুরুপের তাস হন দেম্বেলে। আলো ছড়িয়ে দেম্বেলে জিতে নেন ব্যালন ডি’অর।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন