সুশাসন ও আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেই প্রফেসর এ বি এম আব্দুল্লাহ’র আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক পদ বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার ডা. মো. মোস্তফা কামাল সাক্ষরিত এক বিবৃতিতে নিয়োগ বাতিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় এ তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গৃহীত নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই নিয়োগকে ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করেছে।
এতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত অফিস আদেশে ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আব্দুল্লাহকে তিন বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করা হয়। এই নিয়োগকালে তাঁকে মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা প্রদান করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক দায় ছিল সীমিত এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে আবদ্ধ। উক্ত নিয়োগ বিধি মোতাবেক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সিন্ডিকেট এই নিয়োগ নিয়ে কোনো আপত্তি করেনি।
এতে আরো বলা হয়, তাঁর নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস পূর্বে ২০ জুন ২০২৪ অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ৯২তম সভায় ‘প্রফেসর এমেরিটাস অধ্যাদেশ’ সংশোধনের মাধ্যমে প্রফেসর এমেরিটাস পদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আজীবন নিয়োগের বিধানসহ আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। এটি ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট এর জন্য সিন্ডিকেট মিটিং । এ নিয়োগে অধ্যাপক আব্দুল্লাহর মাসিক সম্মানী নির্ধারণ করা হয় অধ্যাপক হিসাবে তাঁর অবসরে যাওয়ার সময়ের ভেতর ভাতার সমান। এর পাশাপাশি তিনি আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, স্টাফসহ অফিস ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।
বিএমইউ বলছে, সিন্ডিকেটের বাজেট অধিবেশনে মূল এজেন্ডার বাইরে এই ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন নজিরবিহীন ও বেআইনি। এতে প্রতীয়মান হয়, এই নিয়োগ তড়িঘড়ি বিবেচনার মাধ্যমে একজনকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। এ পর্যন্ত তিনি এই খাতে আনুমানিক সাড়ে ১৪ লক্ষ টাকারও অধিক অর্থ গ্রহণ করেছেন।
বিএমইউ আরো বলছে, প্রফেসর এমেরিটাস নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রফেসর এমেরিটাস অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী বিভাগীয় চেয়ারম্যানের প্রস্তাব, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের নিকট উপস্থাপন, উপাচার্য কর্তৃক মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদানের বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আব্দুল্লাহ-এর ক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করে কেবলমাত্র একজন সদস্যের প্রস্তাব অনুযায়ী তাঁকে আজীবনের জন্য প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। যোগ্যতা হিসেবে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই নিয়োগের পর গত প্রায় দুই বছর তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে আসেননি, শিক্ষাদান করেননি, কোনো গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন কিনা প্রশাসনকেও অবহিত করেননি; কিন্তু ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।
বিবৃতিতে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করে, বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর এমেরিটাস পদে নিয়োগের নজির রয়েছে। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনো প্রফেসর এমেরিটাসকে আজীবনের জন্য পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক এবং এ ধরনের বিস্তৃত আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানের নজির পাওয়া যায় না। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পর্যালোচনাকালে দেখতে পায়, এই ব্যবস্থার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত (জবপঁৎৎরহম) আর্থিক দায় সৃষ্টি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ব্যবস্থায় প্রফেসর এমেরিটাস পদ ছিল একটি সীমিত সম্মানীভিত্তিক পদ। কিন্তু ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে প্রচলিত রীতিতে দেয়া সম্মানীর পরিবর্তে কার্যত বেতন-সদৃশ আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এই পরিবর্তন প্রফেসর এমেরিটাস পদের আর্থিক প্রকৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে এবং একটি সম্মানসূচক পদ কার্যত বেতনসদৃশ আর্থিক সুবিধাসংবলিত পদে রূপান্তরিত হয়েছে বলে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি অনুযায়ী অর্থ কমিটির অন্যতম দায়িত্ব হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের তত্ত্বাবধান এবং আর্থিক বিষয়ে সিন্ডিকেটকে পরামর্শ প্রদান। প্রফেসর এমেরিটাস পদের এ ধরনের আর্থিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত ও প্রত্যাশিত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে বিষয়টি অর্থ কমিটিতে উপস্থাপন, আর্থিক বিশ্লেষণ কিংবা অর্থ কমিটির সুপারিশের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ফলে আর্থিক সুশাসনের বিষয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বেআইনি ভাবে এজেন্ডার বাইরে প্রস্তাব উত্থাপন করে, কোনো অধ্যাদেশ সংশোধনের পর একই সভায় সেই সংশোধিত বিধানের সুবিধা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত এবং এ ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। বর্তমান সিন্ডিকেট গত ১৩ই জুনের সভায় সমস্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ২৪শে জুন অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আব্দুল্লাহর আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগকে বিধি বহির্ভূত বিবেচনায় বাতিল করতে বাধ্য হয়।
বিধি অনুযায়ী যদি কোনো নিয়োগ পরবর্তীকালে প্রক্রিয়াগত বা আইনগত ত্রুটির কারণে বাতিল বা অকার্যকর বলে বিবেচিত হয়, তাহলে সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের রয়েছে। সেই অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত সময়ের বেতনের টাকা ফেরত দেয়ার অনুরোধ করেছে।এটি প্রচলিত আইনের বিধান; কাউকে হয়রানি করা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য নয় বলেও দাবি করেছে বিএমইউ।
আজীবনের জন্য প্রফেসর এমেরিটাস পদে অধ্যাপক ডা. এ. বি. এম. আব্দুল্লাহ-এর নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা বলে বিবৃতিতে দাবি করেছে বিএমইউ।বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বাস করে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা রক্ষার স্বার্থে আইন ও বিধিমালার যথাযথ অনুসরণ সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
