একটি কার্যকর মুসলিম জোট গঠনের এখনই সময়

ডনের নিবন্ধ

একটি কার্যকর মুসলিম জোট গঠনের এখনই সময়

ফন্ট সাইজ:

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অবৈধ এবং দূরদর্শিতাহীন যুদ্ধ দৃশ্যত আরব রাজধানীগুলোতে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনার জন্ম দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গিয়ে তারা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পশ্চিম এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য উদীয়মান নতুন, প্রাথমিক পর্যায়ের একটি নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম প্রকাশ্য ইঙ্গিত দেন। তিনি মুসলিম দেশগুলোর একটি ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’ গঠনের আহ্বান জানান এবং ‘বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়া’ ও একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। ইরান যুদ্ধের পর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, বিশেষত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার পরপরই ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও পাল্টা তৎপরতার প্রেক্ষাপটে তিনি এই বক্তব্য দেন।

অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও সামরিক গতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিচ্ছিন্ন ও দ্বন্দ্বপূর্ণ আলোচনার বাইরে নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে। আঞ্চলিক অংশীদারদের মধ্যে নীরব আলোচনা ক্রমশ অগ্রসর হচ্ছে। পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, জিসিসি এবং মিশরকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠিত হতে পারে, যা পরবর্তীতে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, জর্ডানসহ অন্য দেশগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন হবে।

দশকের পর দশক পারস্পরিক বৈরিতার পর ইরান ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে স্পষ্ট যে, এই সম্পর্কোন্নয়নের পথ প্রশস্ত করেছে সৌদি আরব। ইরান বারবার অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে বড় বড় স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হয়েছে এবং বেসামরিক অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে। তবে তেহরান দাবি করেছে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি থেকে চালানো সামরিক হামলার জবাব হিসেবেই তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। রাডার, যোগাযোগ কেন্দ্র, যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ করেনি। তবে খুব দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পর অঞ্চলটিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করা মার্কিন বাহিনী এখন নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে নয়, বরং ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল পরিমাণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা জিসিসি দেশগুলোর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে থাকতে পারে, কারণ তারা নিজেদের আংশিকভাবে অরক্ষিত অবস্থায় দেখতে পেয়েছে।

রাজনৈতিক উদ্বেগও বেড়েছে, যার ফলে যুদ্ধের শুরুর দিকেই পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিশরকে নিয়ে ‘আর-৪’ (রিজিওনাল ফোর) গঠিত হয়। এই গোষ্ঠী ইতিমধ্যে চারবার বৈঠক করেছে, যা তাদের জরুরিতা ও প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত বহন করে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার আঞ্চলিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পাকিস্তান। যুদ্ধপরবর্তী আঞ্চলিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে ইসলামাবাদ নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। ব্যাপক কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কয়েক দিন আগে পাকিস্তানে দুইজন সামরিক নেতার ব্যতিক্রমধর্মী সফরও অনুষ্ঠিত হয়।

৯ জুন লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল রোডলফ হাইকাল ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর দুই দিন পর তুরস্কের স্থলবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মেতিন তোকেল পাকিস্তান সফর করেন। ফিল্ড মার্শাল মুনিরও যুদ্ধ চলাকালে অন্তত দুবার ইরান সফর করেন এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অব্যাহত নৃশংসতা, লেবাননে আগ্রাসন, অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে হুমকি এবং তথাকথিত ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার আদর্শিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের নিরলস প্রচেষ্টাই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেছে যে, ইসরাইল সক্রিয়ভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করছে।

এখন পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলকে নিয়ন্ত্রণ বা সংযত করতে পারছে না। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরব দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি আলোচনাকে তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরের সঙ্গে যুক্ত করার অদ্ভুত প্রচেষ্টা সম্ভবত পরিস্থিতির ভারসাম্য বদলে দিয়েছে এবং আরব দেশগুলোকে নিজেদের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে।
নতুন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট গঠিত হলে তা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইসরাইল ও ভারতের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। তবে এটিও স্পষ্ট যে, যদি সত্যিকার অর্থে কার্যকর একটি মুসলিম জোট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়- যা অনেকাংশে অকার্যকর বলে বিবেচিত ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) মতো হবে না, তাহলে সেই উদ্যোগ নেয়ার উপযুক্ত সময় এখনই।

পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ভবিষ্যতের যেকোনো আঞ্চলিক জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হবে পারস্পরিক আস্থা। ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক এবং জিসিসির সঙ্গে ইসলামাবাদের স্থিতিশীল সম্পর্ক তেহরানের প্রতি কয়েক দশকের বৈরিতা দূর করতে সহায়ক হতে পারে। কারণ মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে দুটি কঠিন যুদ্ধ মোকাবিলা করেও ইরান নিজেকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একটি সম্মিলিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি শেষ পর্যন্ত সেই ইসরাইলি রাষ্ট্রের মোকাবিলার সুযোগ সৃষ্টি করবে, যাকে লেখকের মতে ধারাবাহিকভাবে অস্থিতিশীলতা, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মূল উৎস হিসেবে দেখা হয়। গাজা ও পশ্চিম তীরে মানবতার বিরুদ্ধে তার অপরাধ দীর্ঘদিন ধরে সহ্য করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত, ফিলিস্তিন প্রশ্নই মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
(লেখক এএফপির সাবেক ব্যুরো প্রধান এবং নিজের একটি পডকাস্ট পরিচালনা করেন। তার এ লেখাটি অনলাইন ডন থেকে অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন