পরিবারের দাবি হত্যা

লেবু বিক্রি করে সন্তানদের মানুষ করার স্বপ্ন, শেষ হলো গাছের ডালে ঝুলন্ত লাশে

ফন্ট সাইজ:

জীবনের শেষ বয়সেও থেমে যাননি আব্দুর রহিম খান (৬৫)। সংসারের হাল ধরতে প্রতিদিন ভোরে বের হতেন। পাবনার ঈশ্বরদীর বিভিন্ন বাগান থেকে লেবু কিনে ভ্যানে করে কাশিনাথপুরসহ আশপাশের এলাকায় বিক্রি করতেন। নিজের জন্য নয়, পাঁচ সন্তানকে শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ বানানোর স্বপ্নই ছিল তার একমাত্র পুঁজি। সেই স্বপ্ন যখন প্রায় পূরণের পথে, ঠিক তখনই রহস্যজনকভাবে নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ। পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার বিরাহীমপুর এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রহিমকে নির্যাতন ও শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। বৃহস্পতিবার দুপুরে পাবনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহতের বড় মেয়ে এডভোকেট রুমি খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ অভিযোগ করেন। এ সময় তার ভাই-বোন ও স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে রুমি বলেন, আমার বাবা ছিলেন একজন সৎ, পরিশ্রমী ও নিরীহ মানুষ। সারা জীবন কষ্ট করে আমাদের লেখাপড়া করিয়েছেন। কিন্তু জমির লোভে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা বাবার হত্যার বিচার চাই। পরিবারের অভিযোগ, গত এক দশক ধরে একটি প্রভাবশালী মহল তাদের বসতভিটার জমি দখলের চেষ্টা করে আসছিল। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় হুমকি-ধামকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন রহিম। সাম্প্রতিক সময়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়া হয় বলে দাবি পরিবারের। নিহতের পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২০শে জুন কোনো একসময় রহিম নিখোঁজ হন। পরে ২২শে জুন সকালে বিরাহীমপুর এলাকার একটি আম-লিচুর বাগানে আম গাছের উঁচু ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ দেখতে পান বাগানের মালি আবুল কাশেম। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। তবে পরিবারের দাবি, ঘটনাস্থলের নানা আলামত আত্মহত্যার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মরদেহ উদ্ধারের সময় সেটিতে পচন ধরেছিল, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে হওয়ার কথা নয়। চিকিৎসকের প্রাথমিক প্রতিবেদনে মৃত্যুর আগে শারীরিক নির্যাতনের আলামতও পাওয়া গেছে বলে দাবি তাদের।

এ ছাড়া যে ডালের সঙ্গে মরদেহ ঝুলছিল, সেটি এতটাই উঁচুতে ছিল যে একজন বৃদ্ধ মানুষের একা সেখানে উঠে আত্মহত্যা করা প্রায় অসম্ভব। রুমি আরও অভিযোগ করেন, বাবাকে অন্য কোথাও নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। পরে মরদেহ বাগানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার চাই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, হত্যার আগে জোরপূর্বক কোনো দলিলের মাধ্যমে তাদের বসতভিটার জমি লিখে নেয়া হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখারও দাবি জানান তিনি। এ ঘটনায় গত ২৩শে জুন আমিনপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় মো. আ. করিম খান, মো. আ. আলীমসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, সন্দেহভাজন আরও একজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করা হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। ঘটনার তিনদিন পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও তারা অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে আমিনপুর থানার ওসি হুমায়ুন কবির বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, আব্দুর রহিম খানের বড় মেয়ে আইন পেশায় যুক্ত। বড় ছেলে বিবিএ শেষ করে করে চাকরির সন্ধানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তৃতীয় মেয়ে অনার্সে অধ্যয়নরত ও চতুর্থ মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অপেক্ষায়। এ ছাড়া ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন