বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা

শীর্ষ বৈঠক আজ

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ব্যস্ততা শেষ করে এখন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী দালিয়ান থেকে উচ্চ গতির বুলেট ট্রেনে বিকালে বেইজিং পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। তার সঙ্গে সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানও রয়েছেন। বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের
ফার্স্ট লেডিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়া হয়। লালগালিচা সংবর্ধনাসহ তাদের দেয়া হয় গার্ড অব অনার। আজ থেকেই প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনা, প্রতিরক্ষাসহ নানা বিষয়ে একাধিক চুক্তি, সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), সহযোগিতা দলিল ও ঘোষণাপত্র সই হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানিয়েছে, বুধবার স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটে বেইজিং চাওইয়াং রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান চীনের কাস্টমসমন্ত্রী ও জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমসের প্রধান সান মেইজুন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। একটি সুসজ্জিত চীনা দল তাদের গার্ড অব অনার প্রদান করে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন দিয়াওইউতাইয়ে অবস্থান করবেন। তার সঙ্গে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলাম, উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।

এর আগে গতকাল সকালে দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্স’-এর প্ল্যানারি সেশনে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ শীর্ষক অধিবেশনে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিম মিন-সিওক, কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ, মঙ্গোলিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়াম-ওসর উচরাল, মন্টিনিগ্রোর প্রধানমন্ত্রী মিলোইকো স্পাইজিচ এবং গিনির প্রধানমন্ত্রী আমাদু উরি বাহ অংশ নেন। সম্মেলনের ফাঁকে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন তারেক রহমান। বৈঠকে ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। পানি কূটনীতি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজাখস্তানের প্রস্তাবেও বাংলাদেশের সমর্থনের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

আজ থেকেই চীন সফরের মূল কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানাবেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। পরে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সংযোগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা, স্বাস্থ্য খাত, সাংস্কৃতিক বিনিময়, গণমাধ্যম সহযোগিতা, বিনিয়োগ উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা দলিল সই হতে পারে। পাশাপাশি কিছু প্রকল্পে সহযোগিতা সংক্রান্ত ঘোষণাও আসতে পারে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে অন্তত দুটি চুক্তি সই হবে বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। চুক্তির সম্ভাব্য তালিকায় টপ লিস্টে আছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও চীনের অত্যাধুনিক জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনা। এ ছাড়া এই সফরে তৃতীয়বারের মতো যৌথ ইশতেহার ঘোষণা করবে ঢাকা-বেইজিং।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দিক, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), সহযোগিতা চুক্তি, অ্যাকশন প্ল্যান ও প্রটোকল সইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পর এসব দলিল স্বাক্ষর ও বিনিময় হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, গণমাধ্যম খাতে সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক উল্লেখযোগ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্প স্থাপন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সহযোগিতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অংশীদারিত্ব, কৃষি প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা নিয়েও কয়েকটি দলিল সই হতে পারে। একইসঙ্গে ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহজীকরণ, শুল্ক ও কাস্টমস সহযোগিতা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং পর্যটন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। সফর শেষে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরে একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।

চার দিনের এই সফরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তির পর অনুষ্ঠিত এই সফরকে ঢাকা ও বেইজিং উভয়ই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন