দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ইউরোপ-আমেরিকার মতো বড় বাজার সহ সব বাজারেই কমছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু পোশাক রপ্তানি কমছে এমন নয়। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য কমানোর পাশাপাশি নতুন করে রপ্তানি আদেশ দেয়া কমিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া, আগের অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল করার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তাানি হয়েছে ১৭.৩৬ বিলিয়ন ডলার। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৪০ মিলিয়ন ডলার কম।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে। মে মাসে শক্তিশালী পুনরুদ্ধার হলেও মোটের উপর হিসাব করলে এ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইইউতে বাংলাদেশের রপ্তানি ভালো ছিল। ওই বছর রপ্তানি ৯.১ শতাংশ বেড়ে ১৯.৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই প্রবৃদ্ধি মূলত বেশি দামের কারণে হয়েছে, ক্রয়াদেশের পরিমাণ বাড়ার কারণে নয়। মে মাসের পুনরুদ্ধারেও সামগ্রিক ধীরগতি কাটেনি। এপ্রিলের ১.৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে রপ্তানি বেড়ে ১.৮২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এতে মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯.৬ শতাংশ। জানুয়ারির ১.৮৮ বিলিয়ন ডলারের পর এটি চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাসিক আয়।
তবে এ পুনরুদ্ধার সত্ত্বেও বছরের বড় অংশ জুড়ে রপ্তানি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ছিল। জুলাইয়ে ১.৯৮ বিলিয়ন ডলার থেকে সেপ্টেম্বরে রপ্তানি কমে ১.৩৪ বিলিয়ন ডলারে নামে। পরে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে তা আবার কমে যথাক্রমে ১.৩৫ বিলিয়ন ও ১.৩৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, এপ্রিলের ৩১৬.২ মিলিয়ন ডলার থেকে মে মাসে জার্মানিতে রপ্তানি বেড়ে ৪০৯.৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে রপ্তানি এখনো জুলাইয়ের সর্বোচ্চ ৪৭১.৮ মিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে, এতে বোঝা যায় চাহিদা এখনো আগের পর্যায়ে ফেরেনি।
মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২২.৫ শতাংশই গেছে জার্মানিতে। স্পেন দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে, এককভাবে প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পোশাক রপ্তাানির চিত্র ইতিবাচক না। চলতি বছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১.২৪ শতাংশ। দেশটিতে ইউনিট প্রাইজ কমেছে ২.৪৫ শতাংশ। আর ভলিউমের হিসাবে এই সময়ে মার্কিন বাজারে পোশাক রপ্তাানি কমেছে ৯ শতাংশ।
এ ছাড়া, নতুন বাজারগুলোতেও পোশাক রপ্তানি কমেছে। নতুন বাজারের মধ্যে রাশিয়ায় ৩০.৩৬ শতাংশ, তুরস্কে ১৬ শতাংশ, মেক্সিকোতে ১২ শতাংশ, ভারতে ১১.১৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১১.৭২ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় ১০ শতাংশ কমেছে। এভাবে নতুন বাজারের প্রায় সবগুলো দেশেই পোশাক রপ্তানি কমেছে।
বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বর্তমানে অপ্রচলিত বাজারগুলোর গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তবে অনেক অপ্রচলিত বাজারের ক্রেতারা রপ্তানি ঋণ সুবিধা না দেয়ায় রপ্তানিকারকরা এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। মাহমুদ বলেন, যদি অপ্রচলিত বাজার থেকে রপ্তানি আয় বাড়াতে ব্যর্থ হই, তাহলে দেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরেই কমছে পোশাক রপ্তানি। প্রধান দুই বাজার ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি যেমন কমছে, তেমনই পোশাকের মূল্যও কমছে। এই বিষয়টি নিয়েই আমাদের দুশ্চিন্তা বেশি।
