উঠে আসছে শিক্ষার বেহাল চিত্র

শিক্ষামন্ত্রীর সফর

উঠে আসছে শিক্ষার বেহাল চিত্র

ফন্ট সাইজ:

২রা জুলাই শুরু হচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। মানসম্মত পরীক্ষার বার্তা নিয়ে কুমিল্লা ও নোয়াখালী শিক্ষা বোর্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। আলোচনা করেছেন শিক্ষক-শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে। যাতে উঠে এসেছে শিক্ষার ভঙ্গুর দশা, আর্থিক সংকট, জটিল বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য সংস্কারের ইঙ্গিত। ফলে সফরটি কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক কর্মসূচি না থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার এক ধরনের রূপরেখায় পরিণত হয়েছে।

সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল নকল এবং শিক্ষার মান। সোমবার নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড আয়োজিত আলোচনা সভায় শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, নকল না থাকলে পাসের হার কীভাবে অর্ধেকে নেমে আসে? কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে একসময় পাসের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ থাকলেও ২০২৫ সালে তা ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এখন আর আগের মতো নকল না হলেও ডিজিটাল নকল নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ কারণে পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ডিজিটাল নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে পরীক্ষায় খাতা দেখে লেখা যাতে বন্ধ করা যায় এজন্য আইন সংশোধনের মাধ্যমে দৈব্যচয়নের মাধ্যমে খাতা চেক করার জন্য আইন সংশোনের ইঙ্গিত দেন।

পরীক্ষা পদ্ধতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তার ভাষ্য, আগে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা হতো। এতে প্রশ্নের মান ও কঠিনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতো। এবার একই বিষয়ে অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার কমন বিষয়গুলোতেও একই প্রশ্নপত্র চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। সফরে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন শূন্য পরীক্ষার্থী ও শূন্য ফলাফলের প্রতিষ্ঠান নিয়ে। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা বোর্ডের আওতায় এমন কয়েকটি কলেজ রয়েছে যেখানে এবার একজন পরীক্ষার্থীও নেই। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে গত বছর একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। তিনি বলেন, বছরে একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে গড়ে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। অথচ সেখান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পরীক্ষা না দিলো না বা পাস করলো না এটা মেনে নেয়া যায় না। তবে এমপিও বন্ধ না করে দায়ী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অন্যত্র বদলির মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি। এমনকি যেসব শিক্ষক নিজেদের সন্তানকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে পড়ান না, তাদের ক্ষেত্রেও বদলির ব্যবস্থা নেয়ার ইঙ্গিত দেন। কুমিল্লার সাত শিক্ষা কর্মকর্তা মতবিনিময় সভায় না জানিয়ে অনুপস্থিত থাকায় তাৎক্ষণিক কারণ দর্শানোর নোটিশের নির্দেশ দেন তিনি।

শিক্ষা খাতের আরেক বড় সংকট হিসেবে উঠে আসে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির জটিলতার বিষয়। কুমিল্লা সরকারি কলেজে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, প্রায় ১৩ হাজার মামলার জট রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে নিয়োগ দেয়া যাচ্ছে না। ২০১৭ সালের একটি মামলার কারণে সরকারি প্রাথমিকে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ জনের প্রধান শিক্ষক পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে। একইসঙ্গে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণেও আরও ৭৭ হাজার শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। তার আশা, আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদন্নোতির জটিলতা ২রা জুলাই শেষ হয়ে সমাধানের পথ খুলবে।

শিক্ষকদের আর্থিক দুর্ভোগের বিষয়টিও সফরে গুরুত্ব পায়। এনটিআরসিএর মাধ্যমে মাদ্রাসায় নিয়োগ পাওয়া ১৭ হাজার শিক্ষকের বেতন জটিলতার কথা উল্লেখ করেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগ দিয়েছে ঠিকই কিন্তু বেতনের জন্য বাজেট রাখে নাই। এজন্য আমরা সাফার করছি। এর জন্য প্রতি মাসে প্রয়োজন ৫০০ কোটি টাকা। তবে এই সমস্যারও সমাধান হয়েছে জানিয়ে বলেন, জুলাই থেকে বেতন এডজাস্ট হবে। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরভাতা ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার নিয়ম না মেনে বেসরকারি ব্যাংকে অর্থ রাখে। তারা শিক্ষক-কর্মচারীদের তহবিলের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। এর ফলে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা প্রথমে কিছু করে টাকা সবাইকে দেবো। এরপর ধাপে ধাপে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে আগামী দুই বছরের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান করা হবে।
সফরে শিক্ষা খাতের বাজেট নিয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তার ভাষ্য, এবার শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প শিক্ষা বাজেটের সঙ্গে নানা বিষয় যুক্ত করে প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হয়েছিল। বর্তমানে শিক্ষায় জিডিপি’র ২ শতাংশ বাজেট। এর ধাপে ধাপে এটা বাড়িয়ে এটা ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া হবে, যেটা বিএনপি’র ইশতেহারও বটে।

সংকটের পাশাপাশি সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন ড. মিলন। তিনি জানান, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাবলেট’ কর্মসূচি চালু করা হবে। শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে এবং ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের প্রস্তুতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন। উচ্চশিক্ষা নিয়েও ছিল তার সুস্পষ্ট বার্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের কোর্স চার বছরের মধ্যেই শেষ করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। শিক্ষাজীবনের সময় অপচয় কমাতে ভর্তি ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে সমন্বয় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একইসঙ্গে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আধুনিক বিষয় সংযোজন এবং আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন