কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্ভাব্য নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে রাজধানীসহ সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন করা হয়। সরকার ঢাকাসহ কয়েকটি জেলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করে। নগরীর দুই শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট স্থাপন করা হয় এবং রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়। পাশাপাশি ডিবি, সিটিটিসি, এসবি ও অন্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সক্রিয় ছিলেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) প্রস্তুত রাখা হয়। বিভিন্ন মেস, হোটেলে তল্লাশি চালানো হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেশ কয়েকজন আওয়ামী ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীকে।
গতকাল রাজধানীর গুলিস্তান, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, ধানমণ্ডি, মতিঝিল, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় কড়া নিরাপত্তা বলয়। সকাল থেকেই যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ছিল অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকাসহ আরও চারটি জেলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। এদিন সকালে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর পরিদর্শনে এসে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং পবিত্র মহরম মাসকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাবাহিনীও ঢাকা এবং আশপাশের কয়েকটি জেলায় দায়িত্ব পালন করছে।
আওয়ামী লীগের ৪৪ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার: রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ৪৪ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত দুইদিনে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১৮ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরমধ্যে রমনা থেকে ২ জন, শাহবাগ থেকে ১ জন, ধানমণ্ডি থেকে ২ জন, হাজারীবাগ থেকে ২ জন, বংশাল থেকে ১ জন, সূত্রাপুর থেকে ১ জন, পল্টন থেকে ১ জন, তেজগাঁও থেকে ২ জন, শিল্পাঞ্চল থেকে ১ জন, মিরপুর থেকে ৩ জন, পল্লবী থেকে ১ জন ও কাফরুল থেকে ১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
নিয়াজ মেহেদী বলেন, এর আগে সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের ২৬ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রমনা থেকে ২ জন, ধানমণ্ডি থেকে ১০ জন, বংশাল থেকে ১ জন, খিলক্ষেত থেকে ২ জন, কদমতলী থেকে ১ জন, মোহাম্মদপুর থেকে ৮ জন, মিরপুর থেকে ১ জন ও তুরাগ থানা পুলিশ ১ জনকে গ্রেপ্তার করে। তিনি বলেন, জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ধানমণ্ডি-৩২ থেকে সন্দেহভাজন যুবক আটক: কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে নিরাপত্তা কড়াকড়ির মধ্যে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি ও পুলিশ সদস্যদের ভিডিও করার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আটক যুবকের নাম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নিজেকে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই যুবককে আটক করে পুলিশ ভ্যানে করে ধানমণ্ডি মডেল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ?ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা বলেন, ওই যুবক ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ভাঙা বাড়ির ছবি তুলছিলেন এবং ভিডিও করছিলেন। প্রশ্ন করা হলে তিনি যুক্তিযুক্ত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। ধানমণ্ডি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ৩২ নম্বরে পুলিশের সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে এই যুবক পুলিশের ভিডিও করছিল। তাকে বাধা দিলেও শুনছিল না। এজন্য তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারিনি। জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এরপর বিস্তারিত জানাতে পারবো।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিজিবি মোতায়েন: এদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর সাত জায়গায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে বিজিবি জানিয়েছে, রাজধানীর ধানমণ্ডি, শাহবাগ, আবরার ফাহাদ এভিনিউ, বাংলামোটর, কাওরান বাজার, শেরেবাংলা নগর ও মহাখালীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং সম্ভাব্য যেকোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কক্সবাজার, মাদারীপুর, শেরপুর, গাজীপুর ও মৌলভীবাজার জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে ছয় জেলায় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনা মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
