সারা দেশে আগামী ২৮শে জুন জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে। ক্যাম্পেইনটি ওইদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে। জাতীয়ভাবে এ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬-৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২ কোটি ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৭২ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকায় জেলায় টার্গেট নেয়া হয়েছে ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭৯৯ শিশুকে।
মঙ্গলবার ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ উপলক্ষ্যে জেলা পর্যায়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মিজ্ ফরিদা খানম এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. সরকার ফারহানা কবীর, মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আশিকুর রহমান, ডা. রিফাত শামীম, ডা. নূরেন মুবাশশিরা প্রভা এবং ডা. ফাবলিনা নওশীন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, শিশুরা যাতে ভবিষ্যতে মেধাভিত্তিক সুস্থ জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেই দিকে আমাদের যার যার অবস্থান থেকে নজর দিতে হবে। সুস্থ ও মেধাভিত্তিক প্রজন্ম তৈরি করার জন্যই সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। শিশুরা যাতে দীর্ঘ মেয়াদে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে না ভোগে সেই জন্যই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো জরুরি। ঢাকায় কোনো টিকার সংকট নেই বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। সরকারের এই কাজে আমাদের সকলের সহযোগিতা করা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, কোন শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মারা যাক এটা আমরা কামনা করি না। পৃথিবীতে শিশুরা সুস্থ থাক, এটাই চাই। ক্যাম্পেইনের সফলতা কামনা করে পুলিশের এই কর্মকর্তা প্রচারণার অংশে তার আওতাধীন পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও জানান তিনি।
সিভিল সার্জন জানান, আগামী ২৮শে জুন সারাদেশের ন্যায় ঢাকা জেলাতেও জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৬-১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল রঙের (১,০০,০০০ আইইউ) এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লাল রঙের (২,০০,০০০ আইইউ) ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। ঢাকা জেলায় ৬-১১ মাস বয়সী ৭৫ হাজার ১১৭ জন এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৮২ জন শিশুসহ মোট ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭৯৯ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে ঢাকা জেলায় মোট ১,৭৪৩টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১,৬১৮টি আউটরিচ কেন্দ্র এবং ১২৫টি অতিরিক্ত কেন্দ্র রয়েছে। ভাসমান জনগোষ্ঠীর শিশুদের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট ও খেয়াঘাট এলাকায় এসব অতিরিক্ত কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য ৩,৪৮৬ জন স্বেচ্ছাসেবক এবং ২৯২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করবেন। জনগণকে অবহিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্যাম্পেইনের পূর্বে মাইকিং করা হবে। পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ক্যাম্পেইন সংক্রান্ত প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
সরকার কর্তৃক সরবরাহকৃত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগারে গুণগত মান যাচাই করা হয়েছে এবং এটি শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ বিষয়ে কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে অভিভাবকদের নির্ধারিত কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে এসে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল গ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান সিভিল সার্জন।
ভিটামিন ‘এ’ শিশুর সুস্থ বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান। এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, রাতকানা রোগ ও অন্যান্য দৃষ্টিজনিত সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং চোখের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখে। এছাড়া ভিটামিন ‘এ’ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণের ফলে হাম, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগজনিত জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পায়। এটি ত্বক, শ্বাসতন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে এবং অপুষ্টিজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কার্যকারিতা বজায় রাখে। এছাড়া ভিটামিন ‘এ’ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন, অপুষ্টি প্রতিরোধ এবং ভিটামিন ‘এ’ -এর ঘাটতিজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি বলে তুলে ধরেন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান।
ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাদ্যের মধ্যে রয়েছে-কলিজা (গরু, খাসি, মুরগী), মাছের তেল, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, ডিমের কুসুম, মাখন, পনির, গাজর, পাকা পেঁপে, পাকা আম, লাল ও হলুদ রংয়ের ফলমূল, মিষ্টিকুমড়া, লাল শাক, পালং শাক, কলমি শাক এবং অন্যান্য গাড় সবুজ শাকসবজি।
অভিভাবকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিশুকে অবশ্যই ভরাপেটে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। প্রশিক্ষিত কর্মী কাঁচির সাহায্যে ক্যাপসুলের মুখ কেটে ভেতরের তরল অংশ শিশুকে খাওয়াবেন। জোরপূর্বক অথবা কান্নারত অবস্থায় শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো যাবে না। ৬ মাসের কম বয়সী শিশু, ৫ বছরের অধিক বয়সী শিশু এবং অসুস্থ শিশুদের ক্যাম্পেইনের দিন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে না। ক্যাম্পেইনের দিন কোনো শিশু অসুস্থ থাকলে সুস্থ হওয়ার পর নিকটস্থ স্থায়ী ইপিআই কেন্দ্র থেকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল গ্রহণ করতে পারবে।
