সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছেছে। উভয় পক্ষ একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে ৬০ দিনের সময়সীমায় সম্মত হয়েছে। আলোচনা তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন এবং হরমুজ প্রণালিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও আলোচনার শুরুটা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ এবং ইরানি প্রতিনিধিরা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বৈঠক বর্জন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার টেকনিক্যাল বৈঠক শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি বলেন, লেবানন যুদ্ধ অবসানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি এটিকে প্রথম বাস্তব পরীক্ষা বলে বর্ণনা করেন। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, আলোচনা সোমবার ভোররাত পর্যন্ত চলার কথা ছিল। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।
ইরানি প্রতিনিধিদের ওয়াকআউট
ডনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া একাধিক হুমকিমূলক বার্তার প্রতিবাদে ইরানি প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে মুখোমুখি বৈঠক থেকে বেরিয়ে গেলে আলোচনা উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে শুরু হয়। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দিলে ইরানি আলোচক দলকে অপহরণেরও হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ইরানকে অবশ্যই অবিলম্বে লেবাননে তাদের মোটা অঙ্কের বেতনভোগী প্রক্সিদের ঝামেলা সৃষ্টি বন্ধ করাতে হবে। তারা যদি তা না করে, তাহলে আমরা ইরানকে আবারো খুব কঠোরভাবে আঘাত করবো, ঠিক যেমনটা গত সপ্তাহে করেছি, তবে এবার আরও কঠিনভাবে!!!
ফক্স নিউজের সঙ্গে ২০ মিনিটের এক টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজনে আমরা প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারি। তারা যদি কোনো চুক্তি না করে, তাহলে আমরা টোল আদায় করবো। হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গে তিনি ইরানি আলোচকদের অপহরণের হুমকি দিয়েছেন বলে মনে হয়। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি বলেন, তোমরা এটি বন্ধ করবে, আর তোমাদের কোনো দেশই থাকবে না। তোমরা নিজেদের ওই অভিশপ্ত দেশে ফিরতেও পারবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অপমানজনক বার্তার পর আলোচনা কঠিন পর্যায়ে প্রবেশ করে এবং সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তারা আরও জানায়, আলোচনাস্থল ত্যাগের আগে ইরানি প্রতিনিধিদল কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে। তবে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত থাকে এবং সোমবার ভোরে শেষ হয়। কাতার ও পাকিস্তান জানায়, কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা সপ্তাহের বাকি সময় জুড়ে চলবে।
গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা ও ফলাফল
কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে নিয়ে গঠিত প্রথম উচ্চপর্যায়ের কমিটির বৈঠক তথা লেক লুসার্ন সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, সম্মেলনটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। আলোচনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয়। তার মধ্যে আছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনে সম্মত হয়েছে, যা মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক তদারকি করবে। প্রধান আলোচকরা নিয়মিতভাবে এই কমিটিকে অগ্রগতি জানাবেন এবং পারমাণবিক ইস্যু, নিষেধাজ্ঞা, সমঝোতা স্মারকের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ ও বিরোধ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত কার্যকর গ্রুপগুলোর নেতৃত্ব দেবেন। কমিটি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপে সম্মত হয়েছে। এই সময়সূচি আরও কৌশলগত আলোচনার অবিলম্বে সূচনার পথও সুগম করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালিতে কোনো অনাকাঙিক্ষত ঘটনা এড়াতে একটি যোগাযোগ লাইন প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং ভুল বোঝাবুঝি ও দুর্ঘটনা এড়াতে পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যোগাযোগ লাইন গঠন করা হয়েছে। উভয় দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও লেবাননকে নিয়ে একটি সংঘাত-নিরসন সেল গঠনেও সম্মত হয়েছে, যা মধ্যস্থতাকারীদের সহায়তায় পরিচালিত হবে। সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধের শর্ত মেনে চলা নিশ্চিত করাই হবে এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
মধ্যস্থতার প্রশংসা ইরানের
সোমবার ভোরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় লেবানন যুদ্ধের অবসানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, পাকিস্তান ও কাতারের নিরলস মধ্যস্থতায় লেবানন যুদ্ধের অবসানে বড় ধরনের অগ্রগতি এসেছে। তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর ছাড় দেয়া হয়েছে, অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে, কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। প্রথম বাস্তব পরীক্ষা: লেবানন সংঘাত-নিরসন সেল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। দলে রয়েছেন জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। ইরানের আলোচক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
