জন্মদিনের আগে মেসির সেরা উপহার

জন্মদিনের আগে মেসির সেরা উপহার

ফন্ট সাইজ:

কাল নিজের ৩৯তম জন্মদিন পালন করবেন লিওনেল মেসি। কিন্তু জন্মদিনের কেক কাটার আগেই নিজেকে সেরা উপহারটি দিয়ে ফেললেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচে সেই চিরচেনা বাঁ পায়ের কার্লিং শটে গোল করে হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে, ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায় লিখলেন তিনি। এখানেই শেষ নয়। ম্যাচের শেষ দিকে প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে আরও একটি গোল করে ২-০ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন আর্জেন্টিনার। জন্মদিনের আগের রাতটা এর চেয়ে ভালোভাবে আর কীভাবে কাটানো যায়!

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করা মেসির বিশ্বকাপে মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ ম্যাচে ১৮টিতে। এর আগে জার্মানির কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোজার ১৬ গোলের রেকর্ডটি ছিল অটুট। সেটি এখন অতীত।

শিরোপাধারী আর্জেন্টিনার হয়ে এবারের বিশ্বকাপে রীতিমতো ঝড় তুলছেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে জোড়া গোলের পাশাপাশি সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেয়া। জন্মদিনের আগের দিনটা যেন তার পুরো ক্যারিয়ারের সারসংক্ষেপ হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে তিনি। ক্যারিয়ারে প্রায় সব পুরস্কারই জিতলেও এই গোল্ডেন বুটটি এখনো মেসির সংগ্রহে নেই। হয়তো এই জন্মদিনেই পূরণ হবে সেই অপূর্ণতা।

টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে মেসি ছুঁয়েছেন আরও এক দুর্লভ কীর্তি। ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সের জাস্ট ফঁতেন এবং ব্রাজিলের জাইরজিনহোর পর এই অসাধ্য সাধন করলেন তিনি। টানা সাত ম্যাচে গোল করার নজির বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখনো কেউ গড়েননি। সুযোগ তৈরিতেও শীর্ষে মেসি। অপটার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সাল থেকে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড থেকে মাত্র একটি দূরে তিনি। আর যে রেকর্ডটি ছুঁতে চাইছেন, সেটি তার আদর্শ দিয়েগো মারাদোনার।
এবারের বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্দ কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো নতুন প্রজন্মের তারকারা ইতোমধ্যে নিজেদের ছাপ ফেলছেন বটে। তবে মেসির মুকুট ছিনিয়ে নিতে হলে এই ৩৮ বছর বয়সী জন্মদিনের ছেলেটিকেই আগে তাদের পেছনে ফেলতে হবে।

২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে সাত গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচে হারের পর ৩১ বছর বয়সী মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় হয়তো শেষ হয়ে যেতে পারতো। অনেক সমর্থক হয়তো সেটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু চার বছর পর কাতারে সাত গোল করে দলকে ট্রফি এনে দিলেন। আরও চার বছর পেরিয়ে এখন তিনি ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করলেন। আগামীকাল ৩৯ বছরে পা দেওয়ার আগের রাতে এই ছিল তার নিজের জন্য সেরা উপহার।

সেই ২০১৮ সালের ফ্রান্স দলের সদস্য ওলিভিয়ে জিরু নিজেও এখন ৩৯ বছর বয়সে লীগ ওয়ানে মাঠ কাঁপাচ্ছেন। মেসির পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারেন বলে জানালেন তিনি। বিবিসি স্পোর্টকে জিরু বলেন, ‘মেসির মধ্যে ফুটবলের প্রতি আবেগ কতটা গভীর, সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়। প্রতিযোগী হওয়া, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাগিদ। এটা যেন তার রক্তেই মিশে আছে। এই বয়সে এমন অভাবনীয় ফুটবল খেলতে হলে জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ঘুম, খাওয়া, শরীরের যত্ন। কারণ শরীরই তো আপনার কাজের হাতিয়ার। আর সবচেয়ে জরুরি হলো সেই আকাঙ্ক্ষা, সেই প্রেরণা, সেই ভেতরের আগুন — যা প্রতিদিন মাঠে নামতে উদ্বুদ্ধ করে।’

পেশাদার ফুটবলে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা ক্রীড়া মনোবিজ্ঞানী মাইকেল কফিল্ড মনে করেন, এই বয়সে বড় চ্যালেঞ্জটা শারীরিক নয়, মানসিক। তিনি বলেন, ‘এই বয়সে একজন খেলোয়াড় নিজেকে ভেতর থেকে পুরোপুরি চেনেন, নিজেকে সামলানোর কৌশল নতুন করে শেখার কিছু থাকে না। শারীরিক দিক থেকে তারা ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রতিটি অগ্রগতির সুবিধা নেন। কিন্তু মানসিকভাবে প্রশ্ন হলো—প্রতিদিনের একঘেয়ে লড়াই সামলানোর সক্ষমতা আছে কি না। ২৫ বছর ধরে একই কাজে কঠোর পরিশ্রম করে যাওয়া চাই অসাধারণ আত্মশৃঙ্খলা। সব পুরস্কার জেতার পরও চোটের পুনর্বাসনের কঠিন পথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছাশক্তি রাখতে হয়। সেরা অ্যাথলেটরা সবসময় ভাবেন আরেকবার ফিরে যাবেন। কারণ যা করেন, সেটাকে তারা ভালোবাসেন প্রাণ দিয়ে। ব্রুস স্প্রিংস্টিন বা ম্যাডোনা যেমন এখনো মঞ্চে ওঠেন — এটা সম্পূর্ণ ভেতর থেকে আসা তাগিদ।’
ইন্টার মায়ামিতে তিন বছর ধরে মেজর লীগ সকার খেলছেন মেসি। অনেকের শঙ্কা ছিল, তুলনামূলক কম মানের লীগ খেলতে খেলতে বিশ্বকাপের রাঘববোয়ালদের সামলাতে পারবেন কি না ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে যে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করেছেন, সেটাই এখন বয়সের সীমাবদ্ধতাকে পুষিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ওয়েন রুনি, যিনি ২০০৯ ও ২০১১ চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনালে মেসির বার্সেলোনার কাছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হার সরাসরি দেখেছিলেন। তিনি বলেন,‘এই বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা নিয়ে আমি প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে সে আর এই মানে খেলতে পারবে। কিন্তু বল পায়ে দক্ষতা কেউ কেড়ে নিতে পারে না — বয়স যাই হোক। পেনাল্টি বক্সের আশেপাশে রাখুন তাকে, তিনি এমন কিছু করবেন যা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়।’

বাকি টুর্নামেন্টেও এই ধারা অব্যাহত থাকলে চার বছর পর পরের বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসিকে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন রুনি। তখন মেসির বয়স হবে ৪৩। কিন্তু এই মেসিকে দেখার পর অসম্ভব বলে আর কিছু মনে হয় না। মাঠের বাইরে মেসি সাধারণত শান্ত ও বিনম্র মানুষ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মাঠে পা রাখলেই যেন অলৌকিক শক্তি পেয়ে যান। বার্সেলোনার প্রাক্তন সতীর্থ সেস ফেব্রেগাস বিবিসির তথ্যচিত্র 'রাইভালস: মেসি বনাম রোনালদো'-তে বলেছেন, ‘সাদা দাগ পার হলে সে সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ হয়ে যায়। যেকোনো মূল্যে জিততে চায় সে।’ এই না-থামা জয়ের তৃষ্ণাই একজন তারকাকে সব অর্জনের পরও মাঠে টিকিয়ে রাখে বলে মনে করেন কফিল্ড। তিনি বলেন, ‘অ্যাথলেটরা সবসময় ভাবেন কোথাও না কোথাও এখনো কিছু বাকি আছে। হয়তো এমন কিছু আছে যেটা পুরোপুরি আয়ত্তে আসেনি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো, তারা সেই শৈশবের আনন্দটুকু ধরে রাখতে চান। মেসিকে দেখুন — কিপি-আপস করছেন, রন্দো খেলছেন। আগামীকাল ৩৯ বছরে পা দেয়া এই মানুষটি এখনো একটি ছোট্ট ছেলের মতোই ফুটবলটাকে ভালোবাসেন।’

বয়স মেসির কাছে  একটি সংখ্যা মাত্র। আর সেই সংখ্যাটা আগামীকাল ৩৯ হলেও, মাঠে তিনি চিরকালের মেসিই থাকবেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন