রাজধানী ঢাকার যাত্রীদের জন্য দ্রুতগতির গণপরিবহন মেট্রোরেল। যাত্রী চাহিদার শীর্ষে থাকা এই পরিবহনে ভ্রমণ করতে যাত্রীদের ব্যবহার করতে হয় বিশেষায়িত কার্ড। একক যাত্রার কার্ড, ম্যাস র?্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) পাস আর র?্যাপিড পাস ব্যবহার করে যাতায়াত করা যায় মেট্রোরেলে। এর মধ্যে প্রথম দুটো কার্ড মেট্রোরেলের নিজস্ব। এই দুটো কার্ডের মধ্যে শুরু থেকেই এমআরটি পাসের সংকট যেন কাটছেই না। কার্ড হারিয়ে যাওয়া, চুরি হয়ে যাওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে অপচয় হয় কার্ডের। আবার নতুন করে এই ধরনের কার্ড কিনতে হিমশিম খায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এতে প্রায়শই বন্ধ থাকে নতুন এমআরটি নিবন্ধন। তবে, এবার নিবন্ধন নিয়ে নয়, যাত্রীরা অভিযোগ করছেন, তাদের হারিয়ে যাওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া এমআরটি পাস নতুন করে নিতে পারছে না। অর্থাৎ তারা তাদের মূল পাস রিপ্লেস করতে পারছে না। এতে কার্ডে থাকা ব্যালেন্স হাতছাড়া হয়ে যাওয়াসহ যাতায়াতে ভোগান্তিতে পড়ে যান যাত্রীরা। রেজিস্ট্রেশন করা এমআরটি পাস থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন নতুন করে কার্ড ইস্যু করতে।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই হারিয়ে যাওয়া কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া এমআরটি পাস ইস্যু করতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতি বছর দেড়েক ধরেই চলে আসছে। তবে এখন মূল কার্ড রিপ্লেস করতে না পারলেও নতুন করে কার্ড ইস্যু করার আবেদন নেয়া হচ্ছে। যাত্রীরা বলছেন, তাদের মূল কার্ডের ব্যালেন্সে টাকা থাকলেও সেটা ফেরত পাচ্ছেন না। এমন অসংখ্য যাত্রী তাদের কাঙ্ক্ষিত কার্ড পাচ্ছেন না, হারাচ্ছেন অর্থ।
প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, র্যাপিড পাস হলে রিপ্লেসমেন্ট করতে পারছে এবং আগের ব্যালেন্সও পাচ্ছেন কার্ড রেজিস্ট্রেশন করে থাকলে। তবে এমআরটি পাস হয়ে থাকলে রিপ্লেসমেন্ট সেবা বন্ধই থাকছে, কবে চালু হবে তা জানে না কর্তৃপক্ষও। আর এখন উক্ত কার্ডটি অফ করতে যেকোনো স্টেশন থেকে রি-ইস্যু আবেদন করে রাখার রীতি চালু আছে। এমআরটি পাসের গ্রাহকদের হারিয়ে যাওয়া ব্যালেন্সের টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য নতুন কার্ড ইস্যু করা লাগছে।
নতুন কার্ড ইস্যু করলেই হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া কার্ডের টাকা রিফান্ড করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে গ্রাহকরা বলছেন, তাদের বেশির ভাগেরই চাহিদা একই কার্ডে রিপ্লেসমেন্ট হোক। কেননা নতুন কার্ড ইস্যু করতে বাড়তি অর্থ গুনতে হয় তাদের। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষা করেন কার্ড রি-ইস্যু করার জন্য। বারবার স্টেশনগুলোতে খোঁজ নিয়ে কোনো সদুত্তর পান না যাত্রীরা।
সরজমিন মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, হারিয়ে যাওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া এমআরটি পাস রিপ্লেসমেন্ট করার সুযোগ নেই। ঠিক কবে থেকে চালু হবে সেটিও বলা যাচ্ছে না। স্টেশনের কাউন্টারে একটি রঙিন সতর্কীকরণ পোস্টারে লিখা আছে- ‘যেকোনো প্রকার এমআরটি পাস রি-ইস্যু বা রিপ্লেসমেন্ট সংক্রান্ত সেবা বন্ধ আছে। অসুবিধার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত’।
মেট্রোরেলে নিয়মিত যাত্রী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন নয়ন বলেন, গত এক বছর আগে আমার কার্ডটি পকেটে থেকে ঘষা খেয়ে নষ্ট হয়ে যায়। পরে আমি কার্ড কাউন্টারে গেলেও তারা আমাকে কোনো সমাধান দিতে পারেনি। তারা আমাকে বারবার জানিয়েছিল যে, কার্ড যদি আসে আমরা আপনাকে দিতে পারবো অন্যথায় দেয়া যাচ্ছে না। এখন কার্ডের সংকট রয়েছে তাই কিছু করার নেই। আমি তাদেরকে বলেছিলাম যদি আসে আমি কীভাবে বুঝবো আপনারা কোনো নথি বা কিছু একটা দেন আমাকে, যাতে আমি বুঝতে পারি যে কার্ড এসেছে কিন্তু তারা সেটাও আমাকে দেয়নি। অথচ নিয়মানুযায়ী, কার্ড নষ্ট হয়ে গেলে একটা নির্দিষ্ট চার্জ নিয়ে আমাদের কার্ড করে ইস্যু করিয়ে দেয়ার কথা সেক্ষেত্রে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
আহমেদ নামের আরেকজন ভুক্তভোগী বলেন, একদিন হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই মেট্রোরেলে আমার কার্ড পাঞ্চ করতে গিয়ে দেখলাম কার্ড একটিভ নেই বলে শো করছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি সেখানকার দায়িত্বরতদের দেখালে তারা আমাকে জানায় এটা এখন সমাধান হবে না। এরপর আমি আরও একাধিকবার খোঁজ নিয়েও এটার সমাধান পাইনি। আহমেদ বলেন, এরকমতো শত শত যাত্রীর হচ্ছে। তাদের কার্ডে টাকা থাকে। এই টাকা নেয় কে তাহলে? টাকার কথা বাদ দিলেও, নিয়মানুযায়ীতো কার্ড রিপ্লেইস দেয়ারই কথা।
সার্বিক বিষয়ে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান- ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) থেকে জানানো হয়, এখন রিপ্লেসমেন্ট সেবা না দেয়া হলেও কার্ডে থাকা অর্থ রিফান্ড করা হচ্ছে।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, কিছু কার্ড রিকভার করতে পারছি আমরা। কারণ কিছু কার্ড হাতে থাকে। যার জন্য রিকভারিতে একটু দেরি হচ্ছে। বাট আমরা সবগুলো দিয়ে দিচ্ছি আস্তে আস্তে। সমস্ত এমআরটি পাস রিপ্লেস করে টাকা রিফান্ড করা হচ্ছে, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। শুধু ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। ফর্ম ফিলাপ করে জমা দিলেই ওটা টাকা একাউন্টে চলে যাবে। তবে ইনজেনারেল কেসে রিফান্ডে কোনো ঝামেলা হয় না। ইতিবাচক বিষয় হচ্ছে-রিফান্ড দেয়া হচ্ছে এবং কোনো অসুবিধা হবে না।
১ লাখ এমআরটি পাস আসছে যাত্রীদের জন্য: মেট্রোরেলের যাত্রীদের এমআরটি পাসের ভোগান্তি লাঘবে ১ লাখ এমআরটি পাস কিনেছে ডিএমটিসিএল। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই কার্ড যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছে ডিএমটিসিএল এমডি। ফারুক আহমেদ বলেন, আমরা এমআরটি পাস কিনছি। আগামী ১৫ দিনের ভেতরে নতুন অর্ডার করা কার্ডের সবখানি পেয়ে যাবো। আমি এসিওর করলাম আগামী পনেরো দিনের ভেতর সমস্ত প্রবলেম সলভ হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এমআরটি পাস মার্কেটে আছে ৭ লাখ ৪০ হাজার। আর র?্যাপিড পাস মার্কেটে আছে ৪ লাখ ৮৩ হাজার। মেট্রোরেলে রোজ ৪ লাখের মতো যাত্রী যাতায়াত করে। এরমধ্যে মেট্রোরেলের স্থায়ী কার্ড- এমআরটি ও র?্যাপিড পাস আছে ৯ লাখ ২৩ হাজার। ১৫ দিন পর বাড়তি ১ লাখ এমআরটি পাস যোগ হয়ে মেট্রোরেলের ১০ লাখ ২৩ হাজার কার্ড সচল থাকবে যাত্রীদের জন্য।
