ইলিয়াস আলীকে গুমসহ ২০০ হত্যার নেপথ্যে জিয়াউল, বডিগার্ডের জবানবন্দি

ফন্ট সাইজ:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাক্ষ্যে সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েস র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ইলিয়াস আলীসহ শতাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারই সাবেক রানার (ব্যক্তিগত স্টাফ) সেনা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

ইমরুল কায়েস বলেন, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে কর্মরত অবস্থায় জিয়াউল আহসানের রানার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সে সময় বিভিন্ন গোপন অভিযানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের ২০ থেকে ২৫ দিনের মাথায় গভীর রাতে তাকে র‌্যাব-১ এর সামনে ডেকে নেয় জিয়াউল। সেখানে দু’টি কালো মাইক্রোবাস দেখতে পান। জিয়াউল আহসানের নির্দেশে একটি মাইক্রোবাসে ওঠেন, যেখানে জিয়াউল আহসান, র‌্যাব-১ এর সিইও লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ এবং ক্যাপ্টেন কাওছার উপস্থিত ছিলেন। সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, মাইক্রোবাসটি উত্তরা জসীমউদ্দীন এলাকা হয়ে টঙ্গীর আহসান উল্লাহ ওভারব্রিজ সংলগ্ন স্থানে গিয়ে থামে। এরপর জিয়াউল আহসান তাকে গাড়ির পেছনে থাকা একটি বস্তা নামানোর নির্দেশ দেন। আমি বস্তাটি নামাতে গিয়ে দেখি ভেতরে গেঞ্জি পরা একটি ঠান্ডা লাশ রয়েছে। পরে সেটি রেললাইনের পাশে রেখে আবার মাইক্রোবাসে উঠে যাই। জিয়াউল আহসান তখন রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনিও গাড়িতে ওঠেন
ইমরুল কায়েস বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী ‘অপারেশন রেবেল হান্ট’-এর সময় জিয়াউল আহসান ৮ থেকে ১০ জন বিডিআর সদস্যকে হত্যা করেন বলে তিনি দেখেছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের কিছুতে ইনজেকশন প্রয়োগ করা হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে সিমেন্টভর্তি বস্তা বেঁধে গুলি করে নদীতে লাশ ফেলে দেয়া হয়। তিনি দাবি করেন, ২০১২ সালের দিকে ১১ জন আসামিকে পোস্তগোলা এলাকা থেকে বোটে করে নদীর মাঝখানে নিয়ে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। এ অভিযানে জিয়াউল আহসানসহ র‌্যাবের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া জাফলং সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় পক্ষের কাছ থেকে দুই ব্যক্তিকে গ্রহণ করার পর ঢাকায় ফেরার পথে পৃথক দু’টি স্থানে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
এদিকে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও নিজের সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন ইমরুল কায়েস। বলেন, ২০১২ সালের ১৩ই এপ্রিল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে একটি দল মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে অবস্থান নেয়। সেখানে একটি ‘টার্গেট’কে ধরার প্রস্তুতি চলছিল। জিয়াউল আহসান গাড়িতে বসে বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে টার্গেটের গতিবিধি জানার চেষ্টা করছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত টার্গেট না আসায় অভিযান স্থগিত করা হয়। পরদিন ইমরুল ছুটিতে চলে যান। ছুটিতে থাকা অবস্থায় গণমাধ্যমে জানতে পারেন, বিএনপি’র তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হয়েছেন। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরে র‌্যাব সদরদপ্তরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখতে পান বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, অস্ত্রাগারের ইন-আউট রেজিস্টার ও সিসিটিভি ফুটেজ ধ্বংস করা হয় এবং কয়েকদিন ধরে নিয়মিত ফলো-ইনের সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল। ইমরুল বলেন, নিখোঁজের কয়েকদিন পর র‌্যাব সদরদপ্তরে জিয়াউল আহসানকে ফোনে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে শুনেছিলেন। সে সময় তিনি বলতে শোনেন, ‘স্যার আপনাদের কথামতো ইলিয়াসকে গলফ করলাম, এখন আপনারা এমন করলে হবে।

ইমরুলের দাবি, ওই ফোনকলের অপর প্রান্তে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিক। সাক্ষ্যে ইমরুল কায়েস আরও বলেন, জিয়াউল আহসান বিভিন্ন সময়ে র‌্যাব-১ এর টিএফআই সেল থেকে আনা ব্যক্তিদের গুলি ও ইনজেকশনের মাধ্যমে হত্যা করতেন। তার হিসাবে, এক বছর তিন-চার মাসের মধ্যে তিনি ১৫০ থেকে ২০০ জন মানুষকে বিভিন্ন উপায়ে হত্যা করতে দেখেছেন। জবানবন্দির একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন সাক্ষী। তিনি বলেন, আমি দেশের জন্য শপথ নিয়েছি, দেশের মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়। বিবেকের তাড়নায় এবং সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে আমি সাক্ষ্য দিয়েছি। সাক্ষ্য শেষে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন