এখন ওয়ার্ল্ড কাপ চলছে। মেসি, রোনালদো, এমবাপ্পে খেলছে। তোমাদের মধ্য থেকেও এরকম খেলোয়াড় তৈরি হতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গোল্ডকাপ ফুটবলের ফাইনালে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আরও বলেন, অলিম্পিকে আমরা যাই ঠিকই। কিন্তু অলিম্পিকে যাতে আরও ভালো করতে পারি এজন্য আমরা পরিকল্পনা নিয়েছি। এখানে অনেকে আছে যারা নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে নাম লিখিয়েছে। আমাদের ছোট বন্ধুরা যাতে খেলাধুলা করতে পারে এজন্য আমরা নতুন নতুন মাঠ বের করবো। আমরা কাজ শুরু করেছি। ক্রিকেট দিয়ে সারাবিশ্বের মানুষরা আমাদের চেনে। শুধু ক্রিকেট দিয়ে নয় ফুটবল, সুইমিং, হকি, টেনিসসহ অন্যান্য খেলা দিয়ে আমাদের চিনবে ইনশাআল্লাহ্। তোমাদেরই বাংলাদেশকে গড়তে হবে। লেখাপড়া, খেলাধুলা, কালচারাল এক্টিভিটিস সব করতে হবে।
শনিবার দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (বালক-বালিকা)’-এর চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। খুদে ফুটবলারদের ফাইনাল ম্যাচ রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে সরাসরি উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফাইনালে জয়লাভ করেছে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। খেলা শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথির বক্তব্যে আরও বলেন, আমরা এই খেলা বন্ধ করবো না। বছরের পর বছর এই খেলা চলবে। ২২ লাখ শিক্ষার্থী এই টুর্নামেন্টে খেলেছে গত দেড় মাসে। ১ লাখ ২৩ হাজার ইভেন্ট হয়েছে। কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ কবরো এই ঘটনাগুলো যাতে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকডর্স বুককে জানানো হয়।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু প্রাইমারি না একই গেম সেকেন্ডারিতেও হবে। আগামী বছর থেকে আমরা প্রাইম মিনিস্টারস কাপ ইন্ট্রুডিউজ করবো। তোমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু খেললে চলবে না। অনেকে আছে যারা খেলার পাশাপাাশি অনেকে গান-বাজনা, কোরআন তেলাওয়াতে ভালো পারো। তোমাদের শুধু খেলাধুলা না সংস্কৃতি, কালচার সবকিছুতেই পারদর্শী হতে হবে। তোমরা সবকিছুতে পারদর্শী হলে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্টমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সারা বাংলাদেশে ২২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। আর খেলা উপভোগ করেছেন আরও কয়েক গুণ মানুষ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী চেয়েছেন সুস্থ একটি সমাজ। তিনি চেয়েছেন তৃতীয় একটি ভাষায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষিত হোক। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফাতেও সেটা আছে। বর্তমান সরকারের এই কয়মাসেই অর্ধেক বাস্তবায়িত হয়েছে। এটা হচ্ছে তার নমুনা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদি আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা মহাযঞ্জ শুরু করেছিলাম এপ্রিলের ৬ তারিখে। আমার জানা মতে বিশ্বের সবথেকে বড় এই আয়োজনে ১১ লাখেরও বেশি ছাত্র ও ১১ লাখেরও বেশি ছাত্রী অংশগ্রহণ করেছে। যাতে ৬৫ হাজারেও বেশি স্কুল অংশ নিয়েছে। যেখানে ১ লাখ ২৩ হাজারেও বেশি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, আমাদের সন্তানরা অসাধারণ খেলা উপহার দিয়েছে। সামনের দিনে প্রাইম মিনিস্টার গোল্ড কাপ অনুষ্ঠিত হবে। এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে তোমাদেরই।
প্রথম ফাইনালে বালক বিভাগে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হয় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই খেলায় দরিরামপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দাড়িয়াল মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দ্বিতীয় ফাইনালে বালিকা বিভাগে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আচারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ৪-২ গোলের ব্যবধানে হারায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার জোরগাছা ইউনাইটেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের ফাইনালে এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়। দেশসেরা খুদে ফুটবলারদের ফাইনাল ম্যাচ ও তাদের নৈপুণ্য গ্যালারিতে বসে সরাসরি উপভোগ করতে বিকাল ৪টার দিকে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মাঠে আসার পর তিনি খুদে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। এরপরেই স্টেডিয়াম জুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। ফাইনালের মহারণে নামার আগে মাঠে উপস্থিত সরকারপ্রধানকে কাছে পেয়ে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো স্টেডিয়ামের শিশুরা।
পতাকা উত্তোলন শেষে প্রধানমন্ত্রী যখন ফাইনালে ওঠা বালক ও বালিকা দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হতে মাঠ পরিদর্শনে যান, তখন গ্যালারিতে বসা হাজারো খুদে শিক্ষার্থীর চোখ আটকে যায় তার দিকে। খেলোয়াড়দের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে প্রধানমন্ত্রী হাত নেড়ে গ্যালারিতে বসা শিক্ষার্থী ও সঙ্গে আসা শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে যান। আর তখনই ঘটে সেই অভাবনীয় ঘটনা। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত খুদে শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রীকে একদম কাছ থেকে দেখার লোভে মেতে ওঠে এক আনন্দ-দৌড়ে। গ্যালারির বাধা পেরিয়ে, প্রটোকল বা নিয়মের তোয়াক্কা না করে এক নিমেষেই মাঠের দিকে ‘ভোঁ দৌড়’ দেয় একঝাঁক শিশু।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। ছোট্ট শিশুরা যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেন প্রধানমন্ত্রীকে। নিরাপত্তার বেড়াজাল ভেঙে শিশুরা যখন এভাবে হুড়মুড় করে ছুটে আসে, তখন প্রটোকল অফিসার বা নিরাপত্তা কর্মীদের চোখ-মুখে কিছুটা উদ্বেগের রেখা ফুটলেও প্রধানমন্ত্রীর মুখে ছিল চওড়া ও স্নেহমাখা হাসি। শিশুদের এই বাঁধভাঙা ভালোবাসায় বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে যেন ফিরে গেলেন শৈশবে। হাসিমুখে শিশুদের বাড়ানো শত শত হাতের সঙ্গে হাত মেলান, পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেন এবং হাত নেড়ে তাদের অভিবাদনের জবাব দিতে থাকেন। শিশুদের এই ভালোবাসার জোয়ারে গা ভাসিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে নিয়েই পুরো মাঠ পায়ে হেঁটে প্রদক্ষিণ করেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী মাঠের পশ্চিম দিকের রাইজারে ওঠে পুরো গ্যালারির দর্শকদের উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে তিনি বালিকাদের ফাইনাল খেলা বেলুন উড়িয়ে উদ্বোধন রেফারির বাঁশিতে শুরু হয় খেলা। গ্যালারিতে বসে সেই খেলা উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
