বিশ্বকাপ যেন উপচে পড়ছে না—অন্তত বখশিশের ক্ষেত্রে। নিউইয়র্ক সিটি যখন বিশ্বকাপ উপলক্ষে এক বিশাল আন্তর্জাতিক ফুটবল-উৎসবে পরিণত হয়েছে, তখন স্থানীয় বারটেন্ডার ও রেস্তোরাঁকর্মীরা নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। তাদের অভিযোগ, অনেক বিদেশি দর্শনার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বখশিশ (টিপ) দেয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন না বা তা অনুসরণ করছেন না।
নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামেঅনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ঘিরে আনুমানিক ১২ লাখ ফুটবলপ্রেমী এই অঞ্চলে ভিড় জমিয়েছেন। সকালের ম্যাচ থেকে শুরু করে গভীর রাতের উদযাপন পর্যন্ত দর্শকদের উপস্থিতিতে বার ও রেস্তোরাঁগুলোতে উপচে পড়ছে ভিড়।
ক্যাশ রেজিস্টারে টাকার ঝনঝনানি, বিয়ার বিক্রি হচ্ছে দেদার। আর টেবিলগুলোও থাকছে পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় বখশিশ মিলছে অনেক কম। আর এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু শহর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠন ও রেস্তোরাঁ মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালে কানসাস সিটি, আটলান্টা, এবং ফিলাডেলফিয়ার মতো শহরের অনেক রেস্তোরাঁ বিলের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ২০ শতাংশ বখশিশ (গ্র্যাচুইটি) যোগ করা শুরু করেছে।
সমর্থকদের মতে, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য- যুক্তরাষ্ট্রে টিপের ওপর নির্ভরশীল সার্ভারদের আয় সুরক্ষিত রাখা এবং বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে থাকা বিভ্রান্তি দূর করা। যারা অনেক সময় আমেরিকার বখশিশ সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত নন।
নিউইয়র্কের ওয়েস্ট ৪৬ স্ট্রিটের ম্যাকার্থিজ পাব এনওয়াইসিতে কাজ করা ওয়েট্রেস লুইস ড্যাগেট জানান, আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে ক্লান্তিকর এবং আনন্দদায়ক—দুই ধরনের অনুভূতিই সেখানে মিশে আছে।
ড্যাগেট দ্য পোস্ট-কে জানান, “সবাই খুব ভালো… তারা খুবই জোরে কথা বলে, খুশি থাকে, আর বেশ ভালোও।”
তবে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত রীতি—রসিদে সই করা এবং টিপস হিসাব করা—এ নিয়ে বিভ্রান্ত।
তিনি বলেন, “এটা খুবই ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আর অনেকেই বখশিশ রেখে যাচ্ছেন না।”
বড় বড় গ্রুপ যখন কয়েক ঘণ্টা ধরে একের পর এক পাইন্ট (বিয়ার) অর্ডার করে, তখন বিষয়টা সত্যিই কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
ড্যাগেট জানান, “এমন অনেক টেবিল এসেছে যাদের বিল প্রায় ৭০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ দর্শনার্থী আসলে অসভ্য আচরণ করছেন না—তারা কেবল এখানে কীভাবে সবকিছু কাজ করে, সেই নিয়মটা জানেন না।
তিনি বলেন, “তারা অবশ্যই জিজ্ঞেস করে। তারা বলে, ‘ওহ, এটা কীভাবে করব?’ আমি তাদের বুঝিয়ে বলি যে, এখানে শহরে টিপ দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটি ভালো অভ্যাস।”
আর ভিড় সামলাতে অতিরিক্ত স্টাফ আনা, দীর্ঘ শিফট এবং আগেভাগে খোলা—সব কিছুই বাড়তি চাপ তৈরি করলেও ড্যাগেট বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন।
তিনি বলেন, “সব মিলিয়ে আমার কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা হয়নি, কারণ তারা খুবই খুশি ও উৎসাহী থাকে। আর তারা চেষ্টা করে।”
নবম অ্যাভিনিউয়ের ৫, ন্যাপকিন বার্গার এর এক হোস্টেস জানান, পর্যটকদের ভিড়ে বুথগুলো সামলানো তাদের জন্য প্রায় অভিভূত হওয়ার মতো হয়ে উঠেছে। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, রেস্টুরেন্টে থাকা একমাত্র টেলিভিশনেই দর্শনার্থীরা খেলা দেখছেন।
এর কিছু ব্লক দূরে অবস্থিত হার্লি স্যালুন-এর সহ-মালিক অ্যান ক্যালিমানো জানান, এই টুর্নামেন্ট শহরের সাধারণত ধীর মৌসুমটাকে একটানা উৎসবমুখর পরিবেশে বদলে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “এটা সকাল, দুপুর, রাত—সব সময়ই ব্যস্ততা চলছে। আর নিক্স-এর কারণে, ‘গো নিক্স’, সবকিছুই দারুণ, একদম দারুণ হয়ে গেছে। শনিবার রাতে এখানে নড়াচড়া করারও জায়গা ছিল না।”
ব্যবসার জন্য ভিড় ভালো হলেও বখশিশের ক্ষেত্রে তেমন সুবিধা হচ্ছে না।
ক্যালিমানো বলেন, “আমি বলতে চাই, স্বাভাবিকভাবেই তারা আমাদের মতো টিপ দেয় না।”
তবুও তিনি মনে করেন, এই বিভ্রান্তির মূল কারণ লোভ বা কৃপণতা নয়—বরং সাংস্কৃতিক পার্থক্য।
অর্থাৎ, অনেক দর্শনার্থী শুধু স্থানীয় টিপিং নিয়ম না জানার কারণেই কম বখশিশ দিচ্ছেন।
অনেক দেশে এর প্রচলন খুব কম বা একেবারেই নেই। কারণ ইউরোপের অনেক রেস্তোরাঁতে কর্মীদের বেতন অন্যান্য পেশার মতোই নিয়মিতভাবে দেওয়া হয়—তারা বখশিশ ওপর নির্ভরশীল নন। তাই অনেক গ্রাহকের ধারণা থাকে, সেবার খরচ আগেই বিলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ক্যালিমানো বলেন, “বারটেন্ডার যখন জিজ্ঞেস করে, ‘সবকিছু ঠিকঠাক ছিল তো?’ তখন তারা বলে, ‘হ্যাঁ।’ কারণ ইউরোপে… (টিপ) আগেই দামের মধ্যে ধরা থাকে, আর তারা সেটাই ধরে নেয়।”
তিনি আরও জানান, তার স্টাফরা এখন এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছে।
ভিড় ব্যবসার জন্য দারুণ হলেও বখশিশের দিক থেকে সবাই একরকম উদার নন।
বারটেন্ডার ক্যাথাল রেনল্ডস বলেন, “তারা জানে যে ২০% বা ওই ধরনের বখশিশ তারা সবসময় দেবে না।”
তবুও তিনি বিষয়টিকে খুব নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। তার মতে, বেশিরভাগ সময় দর্শনার্থীদের দোষ নয়—এটা মূলত সংস্কৃতিগত পার্থক্য।
তিনি আরও বলেন, গার্ভি আইরিশ পাব এখন পুরো দমে চলছে। আর এই সময় শহরের পরিবেশও একেবারে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, “এখানে আসার জন্য তারা আগেই অনেক টাকা খরচ করে ফেলেছেন। তাই বখশিশ নিয়ে আমি খুব বেশি চিন্তিত নই।”
তার পরামর্শ হলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ করা।
তিনি বলেন, “আপনি যদি এখানে আসেন, তাহলে এখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই ভালো—তাতে আপনি আরও ভালো অভিজ্ঞতা পাবেন।” সূত্র- নিউ ইয়র্ক পোস্ট
বিশ্বকাপ দর্শনার্থীরা দিচ্ছেন না বখশিশ, পাল্টা পদক্ষেপ নিউইয়র্কের রেস্তোরাঁ মালিকদের
বিশ্বকাপ ২০২৬
১ ঘন্টা আগে
২০ জুন (শনিবার), ২০২৬, ৯ঃ১৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
