সোমবার নিউ জার্সির পিংরি স্কুলের সবুজাভ মাঠে স্প্রিংকলারের পানির ফোয়ারার মাঝ দিয়ে ফুটবল ড্রিবল করছিলেন মরক্কো জাতীয় দলের তারকা আশরাফ হাকিমি। খালি গোলপোস্টের ভেতরে দাঁড়িয়ে, বুগলিয়ারি ওয়ার্ল্ড কাপ ফিল্ড নামের সেই যত্নে রক্ষিত মাঠের তত্ত্বাবধায়ক নিল স্পাগনুয়োলো বুট পরে দুই হাতে কোমর চেপে হাকিমি ও তার সতীর্থদের অনুশীলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
এর দুইদিন আগে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে শক্তিশালী ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে মরক্কো। আর অনুশীলনের জন্য পিংরিতে ফেরার সময় দলটি বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ছয় নম্বরে উঠে আসে। তবে এসব কিছুতেই খুব একটা মুগ্ধ হননি স্পাগনুয়োলো। তার একমাত্র চিন্তা ছিল ঘাস।
তিনি বললেন, ‘আমি একেবারে সেই চিরাচরিত বুড়ো মানুষটার মতো, যে চিৎকার করে বলে, ‘আমার লন থেকে নেমে যাও!’
খেলোয়াড়রা যে, কোনো ভুল করছিলেন, তা নয়। তবে পিংরির মাঠ তত্ত্বাবধায়ক স্পাগনুয়োলো নিজেই সবার আগে স্বীকার করবেন, তিনি মাঠের ব্যাপারে অত্যন্ত রক্ষণশীল।
যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজনকে সামনে রেখে তিনি এবং নিউ জার্সির বাস্কিং রিজে অবস্থিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিংরির একদল কর্মী ও প্রশাসক ফিফার মানদণ্ড অনুযায়ী দু’টি দৃষ্টিনন্দন ঘাসের মাঠ সমপ্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি বড় টিলা সরিয়ে ফেলেছিলেন। স্পাগনুয়োলো এখন কেনটাকি ব্লুগ্রাসের মাঠটির প্রতি নিবিড় যত্নশীল। মাঠটি দেখতে পূর্ব রাদারফোর্ডে ৩৬ মাইল দূরে অবস্থিত মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠের চেয়েও বেশি নিখুঁত মনে হচ্ছিল। এখানে বিশ্বকাপের আটটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্বকাপের একটি দলকে আতিথ্য দিতে পিংরিকে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সুনির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ না করলেও স্বীকার করেছে, এটি ছিল ‘বহু-মিলিয়ন ডলারের’ একটি উদ্যোগ। এই ঐতিহ্যের সূচনা হয় ১৯৯৪ সালে, যখন প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। এরপর থেকে ইতালি, স্কটল্যান্ড, প্যারিস সেন্ট-জার্মেই, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, যুক্তরাষ্ট্রের নারী ও পুরুষ জাতীয় দলসহ আরও অনেক দল পিংরি স্কুলকে নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।
সবকিছুর শুরু চার্লি স্টিলিতানোর হাত ধরে। নিউ জার্সির এই স্থানীয় বাসিন্দা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে স্থানীয় আয়োজক কমিটির প্রধান ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকে তিনি পিংরির তারকা খেলোয়াড় ছিলেন এবং খেলেছিলেন মিলার বুগলিয়ারির অধীনে। যিনি এখনো ৯১ বছর বয়সে দলটির কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সে সময় ইতালি দল যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঘাঁটি খুঁজছিল। তখন দেশে কোনো বড় পেশাদার ফুটবল লীগ ছিল না। আর স্টিলিতানোই ইতালিয়ানদের কাছে পিংরির সুপারিশ করেছিলেন।
তৎকালীন ৫৯ বছর বয়সী বুগলিয়ারি এই ধারণাটি খুবই পছন্দ করেছিলেন। স্কুল প্রশাসনের কাছে এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ১৯৪০-এর দশকে তিনি পিংরির তারকা খেলোয়াড় ছিলেন। পরে স্প্রিংফিল্ড কলেজে খেলার অধ্যায় শেষ করে জীববিজ্ঞান শিক্ষক ও কোচ হিসেবে পিংরিতে ফিরে আসেন। বিশ্বের অন্যতম সেরা দল ইতালিকে আতিথ্য দেয়ার আকর্ষণ তার কাছে ছিল স্পষ্ট। তবে তখন সবাই একইভাবে বিষয়টিকে দেখেনি।
তিনি বলেন, ‘কিছু মানুষ বিষয়টি ঠিকভাবে বুঝতে পারেনি। কেউ একজন বলেছিল, ওই মাঠে জুনিয়র ভার্সিটি বেসবল দলের দু’টি ম্যাচ আছে, তারা তাহলে কী করবে? আমি বলেছিলাম, ‘ঠিক আছে, তারা অন্য কোনো স্কুলে গিয়ে খেলুক। কিন্তু আমরা একটি দারুণ সুযোগ হারাতে বসেছি। এটি এই স্কুলকে সবার নজরে এনে দেবে।’
ইতালিয়ানরা, যারা সেই বছর টুর্নামেন্টের ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, জায়গাটিকে এতটাই পছন্দ করে যে, তাদের ফেডারেশনের প্রধান অ্যান্তোনিও মাত্তারেসে তার কুকুরের নাম রাখেন ‘পিংরি’। এই স্বপ্ন ছিল যে, এবার এই বিশ্বকাপে ইতালিকে ফিরিয়ে এনে সেই চক্রটি পূর্ণ করা হবে, কিন্তু ইতালি যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। পরিবর্তে, ২০২২ সালে সেমিফাইনালে পৌঁছানো মরক্কো সেই স্থানটি পায়।
বুগলিয়ারি বলেন, ‘ইতালির মধ্যে একটা স্বতঃস্ফূর্ত সৌন্দর্য আছে, কিন্তু মরক্কো বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর একটি। এখানকার বাচ্চারা তাদের সব খেলোয়াড়কে চেনে।’ আর ৩২ বছর আগের তুলনায় এখন মাঠটি অনেক বেশি উন্নত।
ইতালির জন্য যতটা ভালোই হোক না কেন, পিংরির প্রশাসকরা জানতেন যে, মাঠটির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। তারা একটিকে সমপ্রসারিত করে দুইটি মাঠে রূপান্তর করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে পিংরির শেষ ফুটবল ম্যাচ খেলার পরের দিনই নির্মাণকাজ শুরু করেন। ফিফার নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ করে ২০২৫ সালের বসন্তের মধ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন পাওয়ার জন্য তাদের হাতে সময় ছিল।
সময় সীমিত থাকায় সপ্তাহের সাত দিনই কাজ চলেছে। সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রকল্পের জন্য অর্থ অনুদান দিয়েছেন। তাদের একজন, যিনি একটি নির্মাণ কোম্পানির মালিক, তিনি ভারী যন্ত্রপাতি-ব্যাকহো এবং হাইড্রোলিক হাতুড়িসহ-বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দেন, যা দিয়ে টিলা অপসারণ ও মাঠ সমতল করা হয়।
স্কুলের প্রধান টিম লিয়ার এই প্রকল্পে এত কিছু ঝুঁকির মধ্যে থাকায় কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তবে ৯০-এর দশকের পূর্বসূরিদের মতো নয়, পিংরিরই একজন সাবেক শিক্ষার্থী এবং বুগলিয়ারির জীববিজ্ঞানের ছাত্র লিয়ারকে এ বিষয়ে বোঝাতে হয়নি।
তিনি বলেন, ‘যখন আপনি কোনো কিছু আকারে দ্বিগুণ করেন, তখন সংগঠনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং আমাদের মানুষদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কাজ চাওয়া হয়। আর এটা তো স্কুল পরিচালনার কাজের ওপর অতিরিক্ত।’
এরপর মার্চে, যখন মাঠ প্রস্তুতির কাজ চলছিল, ইতালি চমকপ্রদভাবে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এমনকি খুব বাস্তব সম্ভাবনাও ছিল যে, অন্য কোনো দল তাদের জায়গা নেবে না।
তিনি বলেন, ‘এটা হতে পারতো, আর তখন সবাই বলতো, ‘আরে, এটা কী হলো?’
বিশ্বকাপের ৪৮টি দল তাদের প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ যেখানে হবে, তার কাছাকাছি অবস্থানকে বিবেচনায় রেখে কয়েক মাস আগেই নিজেদের অনুশীলন কেন্দ্র বেছে নেয়। কেউ কেউ বেছে নিয়েছে এমএলএস ক্লাবগুলোর সুবিধাসমৃদ্ধ ক্যাম্প, আবার কেউ কেউ কলেজ এবং এমনকি উচ্চ বিদ্যালয়কেও বেছে নিয়েছে।
পিংরিতে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর একের পর এক দল জায়গাটি পরিদর্শনে আসে। লিয়ার বলেন, ‘সেনেগাল, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, জার্মানি। সবাই এখানে এসেছে।’
কিছু দল তো আগে থেকে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিয়েই চলে আসে। স্কুল, ফিফা এবং দলগুলোর মধ্যে প্রধান সংযোগকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা পিংরির অ্যাক্সিলিয়ারি অপারেশনস ডিরেক্টর কার্ল ফ্রাই এই সফরগুলো সমন্বয় করতেন।
কখনো কখনো হঠাৎ ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে ফোন আসত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর তারা বলতো, ‘উম, কলম্বিয়া এখানে এসেছে।’ আরও তিনটি দল নিউ জার্সিতে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করেছে, যার ভাড়া পরিশোধ করেছে ফিফা। হাইতি অবস্থান করছে স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং সেনেগাল রুটগার্সে।
ব্রাজিল বেছে নিয়েছে কাছাকাছি মরিস টাউনশিপ, নিউ জার্সিতে অবস্থিত নিউ ইয়র্ক রেড বুলস এমএলএস দলের ১০ কোটি ডলারের নতুন সুবিধাসমৃদ্ধ কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে আটটি মাঠ, সুইমিং পুল, জিম, পুষ্টি কেন্দ্রসহ একটি পেশাদার দলের প্রয়োজনীয় সবকিছু।
মরক্কো দল, যাদের দ্বিতীয় ম্যাচ শুক্রবার বোস্টনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে, পিংরিকে নিজেদের ক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে। স্কুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মরক্কো দলকে আতিথ্য দেওয়ার জন্য ফিফা তাদের প্রায় পাঁচ লক্ষ ডলার দেয়। দলটি কাছাকাছি একটি শান্ত হোটেলে অবস্থান করছে।
অনির্ধারিত সময়সূচি এবং অনুশীলনের সময় মাঠে পানি দেয়ার মতো বিশেষ অনুরোধের কারণে তারা স্পাগনুয়োলোকে বেশ ব্যস্ত রেখেছে। সমপ্রতি ৬০০ জন পিংরি কমিউনিটির সদস্যের জন্য উন্মুক্ত একটি অনুশীলনের পর, মরক্কোর ব্যাকআপ গোলরক্ষক মুনির এল কাজুইকে মাঠ সম্পর্কে মতামত জানতে চাওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘অসাধারণ। এটা খুবই ভালো।’
মরক্কো দল গ্রুপ পর্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে জুলাই পর্যন্ত পিংরিতে তাদের অবস্থান বাড়াতে পারে। কিন্তু তারা হেরে গিয়ে আগেভাগে বিদায় নিলে অন্য কোনো দল সেখানে চলে আসতে পারে। এই ক্যাম্পাসটি মেটলাইফ স্টেডিয়ামের কাছাকাছি অবস্থিত, যেখানে নকআউট পর্বের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে ১৯শে জুলাইয়ের ফাইনালও রয়েছে।
এরপর মাঠগুলো আবার স্কুলের হাতে ফিরে যাবে, এবং ভবিষ্যতে আরও পেশাদার ভিজিটিং দলও সেখানে অনুশীলন করবে। কিন্তু শরৎকালে পিংরির মেয়েদের ও ছেলেদের দল বিশ্বকাপ প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপযোগী মাঠে খেলার সুযোগ পাবে, যেখানে স্পাগনুয়োলো প্রতিটি ঘাসের পাতার ওপর নজর রাখবেন।
সূত্র- নিউ ইয়র্ক টাইম্স
