বাড়ি দখল, পরে বিএনপি’র অফিস বানান এডভোকেট জিল্লুর

বাড়ি দখল, পরে বিএনপি’র অফিস বানান এডভোকেট জিল্লুর

ফন্ট সাইজ:

অনেকটা বাংলা সিনেমার মতোই ঘটনা। বাড়ির মালিক সানজিদা শেলী শাপলা বুঝে ওঠার আগেই তার তিন তলা আবাসিক ভবনের তালা ভেঙে, ড্রিল মেশিন দিয়ে দরজা কেটে দখল করেন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা এডভোকেট জিল্লুর রহমান। দখলের সময় ১৫-১৬ জন সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে শাপলা, তার বৃদ্ধ পিতা এবং সন্তানদের। উপায় না পেয়ে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দেয় শাপলার ভাই। ফোন পেয়ে সাঘাটা থানায় দায়িত্বরত পুলিশ বিরক্ত হয়ে বলেন, আপনাদের ঈদ নেই? এ সময় ফোন দিয়েছেন কেন? ঘটনাস্থল থেকে থানার দূরত্ব আধা কিলোমিটার হলেও পুলিশ পৌঁছায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর। এতক্ষণে সন্ত্রাসী দিয়ে ওই বাড়ি দখল এবং বাড়ির প্রকৃত মালিক শাপলা এবং তার সন্তানদের বের করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়। সাঘাটা থানার আল আমিন নামের একজন পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সন্ত্রাসীদের পক্ষ হয়ে কাজ করেছেন বলেও জোরালো অভিযোগ উঠেছে। দখল করা বাড়িতে এখন বিএনপি’র পার্টি অফিস করা হয়েছে। লাগানো হয়েছে দলীয় সাইনবোর্ড।

ঘটনা গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা উপজেলার ডাকবাংলা বাজারে। অভিযুক্ত এডভোকেট জিল্লুর রহমানের ফেসবুক পেজে বিভিন্ন সময় পোস্টার, ব্যানারের সূত্র ধরে জানা যায় তিনি জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের জুনিয়র হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করেন। গ্রামের বাড়ি সাঘাটার ঘুড়িদহে।

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর থানায় মামলা না নেয়ায় ভুক্তভোগী নারী গাইবান্ধার এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে এবং বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পৃথক মামলা করেছেন। এ ছাড়া গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও র?্যাব-১৩ রংপুর ক্যাম্পেও লিখিত অভিযোগ জমা দেয়া হয়েছে।

নথি ও মামলার আরজি সূত্রে জানা যায়, ঝাড়াবর্ষা গ্রামের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম এবং স্ত্রী শাপলা স্থানীয় খলিলুর রহমানের কাছ থেকে ২০১৪ সালের ১৫ই ডিসেম্বর ৫ শতক জমি স্বামী-স্ত্রীর নামে কবলা দলিল করে নেন। শাপলার পিতা শাহাদুজ্জামান সাজু তার অর্থায়নে মেয়ে এবং মেয়ে জামাইকে ওই জায়গা ক্রয় করে দেন। পরে পিতা এবং শাপলার স্বামীর যৌথ অর্থায়নে একটি তিন তলা ভবন নির্মাণ করে দুই সন্তানসহ বসবাস করে আসছিলেন। শাপলার স্বামী সাবেক সেনা সদস্য অবসরে যাওয়ার পর ক্যাসিনোয় জড়িয়ে পড়েন। সেইসঙ্গে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে শাপলা তার ভবনের অংশ উল্লেখ করে জমি দুই ছেলের নামে দলিল করে দেন ২০২৫ সালের জুলাইয়ের ২ তারিখে।

এডভোকেট জিল্লুর রহমান শাপলার স্বামী আশরাফুলকে বিভ্রান্ত করে তার মালিকানাধীন অংশের ফাঁকা জমি দলিল করে নেন চলতি বছরের ১৫ই এপ্রিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৭শে মে ঈদুল ফিতরের আগের দিন ভোর ৫টার দিকে জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোটা, লোহার রড, রামদা এবং ড্রিল মেশিন নিয়ে ওই তিন তলা ভবনে হামলা চালায়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতেই ফাঁকা জায়গা এবং বাড়িটি দখলে নেয়। সানজিদা শেলী শাপলা মানবজমিনকে বলেন, হামলাকারীরা ভবনের কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর তিন তলার শয়নকক্ষের দরজা ড্রিল মেশিন দিয়ে কেটে ভেতরে ঢুকে তার চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং শ্লীলতাহানি ঘটায়। ভুক্তভোগী ওই নারীর পরিধেয় বস্ত্র ও স্বর্ণালংকার (আট আনা ওজনের চেইন) ছিনিয়ে নেয়া হয়।

মারধরের সময় শাপলার ১৮ বছর বয়সী ছেলে আসিফ রেজা শুভ এবং তার বৃদ্ধ পিতা শাহাদুজ্জামান সাজু এগিয়ে এলে তাদের ওপরও নির্যাতন চালানো হয়। শুভকে হাতুড়ি, কাঠের লাঠি ও ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাথায় ও কপালে গুরুতর জখম করা হয়। হামলাকারীরা শাপলার বৃদ্ধ পিতার মুখে ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও পিটিয়ে জখম করে। একপর্যায়ে শাপলা ও তার সন্তানদের জামাকাপড় ধরে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। যাওয়ার সময় ঘরের শোকেস, ওয়ারড্রব ও ড্রেসিং টেবিল ভাঙচুর করে প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়।
শাপলার পিতা শাহাদুজ্জামান সাজু মানবজমিনকে জানান, ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় আমি এবং আমার নাতি আসিফ রেজা শুভসহ অন্যদের সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসা শেষে সাঘাটা থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।

আসামিরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় থানা কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। পরে ভুক্তভোগী পরিবার গাইবান্ধা আদালতে মামলা করেন। তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে দেড় বছর আগে তার অংশের জমি এবং জমির উপর নির্মিত ভবন তার দুই নাবালক ছেলের নামে লিখে দেয়। সেই জায়গা জিল্লুর দুই মাস আগে কীভাবে ক্রয় করেন সেটা আমার বোধে আসে না। শাপলার স্বামী আশরাফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, আমি নেশাগ্রস্ত না। আমি অনলাইনে জুয়াও খেলি না। আমার বিষয়ে এসব মিথ্যা কথা বলেছে শাপলা। জমিটি তার ছেলেদের নামে লিখে দেয়ার বিষয়টি তিনি পূর্বে জানতেন না বলেও জানান। বিষয়টি নিয়ে এডভোকেট জিল্লুর রহমানের সঙ্গে কথা বললে তিনি মানবজমিনকে জানান, এলাকার পার্টির লোকজন আমাকে ধরেছে একটা অফিস করার জন্য এজন্য আমি ভবনটি স্কয়ার ফুট হিসেবে ক্রয় করেছি। বাড়িটি আমি দখল করিনি। আশরাফুল নিজের বাড়িটি আমাকে দখল করে দিয়েছেন। আমার বাড়ি আছে এজন্য এটা বিএনপি’র পার্টি অফিস করে দিয়েছি।




কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন