প্রথম আলো
‘আলোচনায় না এলেই তদন্ত থেমে যায়’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কিন্তু এর উল্টো চিত্রও রয়েছে। দেশে অনেক ধর্ষণ ও হত্যা মামলা মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তদন্ত পর্যায়েই আটকে আছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশির ভাগ ঘটনায় তা মানা হয় না।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যেসব ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়, সেসব ক্ষেত্রে তদন্ত তুলনামূলক দ্রুত এগোয়। কিন্তু আলোচনার বাইরে থাকা অধিকাংশ মামলার তদন্তে গতি পায় না।
তবে পুলিশ বলছে, ডিএনএ পরীক্ষা, মেডিক্যাল প্রতিবেদন এবং ফরেনসিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মামলার তদন্ত নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয় না।
গত বছরের ৫ মে বান্দরবানের থানচির তিন্দু ইউনিয়নের মংখ্যং পাড়ায় জুমখেতে ধান রোপণ করতে যান চিংমা খিয়াং নামের এক নারী। সন্ধ্যায় বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন খুঁজতে গিয়ে তাঁর মরদেহ পান। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, রাস্তার কাজে নিয়োজিত তিন শ্রমিক তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরদিন ওই নারীর স্বামী সুমন খিয়াং বাদী হয়ে থানচি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে মামলা করেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে এলাকার লোকজন মানববন্ধন করেন। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দ্রুত বিচার চেয়ে বিবৃতি দেন ৪৭৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
এই মামলা সম্পর্কে খোঁজ নিতে গত শনিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকারের সঙ্গে। তিনি কিছুদিন আগে এখানে যোগ দিয়েছেন জানিয়ে বলেন, এ মামলার আসামিদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মামলার অগ্রগতিও সেভাবে হয়নি।
৩ মাসে সাড়ে ৫ হাজার মামলা
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের থানাগুলোতে হয়েছে ৪১৩ মামলা।
ঢাকার আদালত সূত্র জানায়, ৪১৩টি মামলার মধ্যে ৩ মাসে ৬৫টির অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। আর ঘটনার সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা না পেয়ে ১০টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর তদন্ত শেষ হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত তিন মাসে ডিএমপির ৫০টি থানার অধীনে শুধু ধর্ষণের অভিযোগে ১৭৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার সংখ্যা ১১৫ এবং শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলার সংখ্যা ৬৩।
গত ২২ মে রাতে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি আট বছর বয়সী শিশুকে চকলেট খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে রাজধানীর কলাবাগানের নর্থ সাউথ রোডের বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পুলিশ ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক শনিবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
ধর্ষণ মামলার তদন্ত শেষ করতে কেন দেরি হয় জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তের সময়সীমা পুলিশ মানার চেষ্টা করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করা না গেলে আদালতে আবেদন করে সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়। অনেক মামলায় ডিএনএ টেস্ট ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বেশি সময় লেগে যায়। তবে তদন্ত শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
গত ২২ এপ্রিল কুমিল্লার মুরাদনগরে স্কুল থেকে ফেরার পথে অপহৃত হয় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রী। দুই ব্যক্তি মুখ চেপে ধরে ওই ছাত্রীকে হোমনা উপজেলার কুটুমবাড়ি-সংলগ্ন একটি নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করে। বিকেলে গুরুতর অসুস্থ ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে স্কুলের সামনে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনায় মেয়েটির মা মুরাদনগর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনেরা। মামলায় সাইফুল ইসলামসহ দুজনের জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে যোগাযোগ করা হলে মুরাদনগর থানার ওসি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা পালিয়ে গেছে। মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হলেও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
ধর্ষণ মামলা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ মামলার তদন্ত শেষ করতে না পারার অন্যতম কারণ মেডিক্যাল প্রতিবেদন না পাওয়া। এই প্রতিবেদন পেতে অনেক সময় এক বছরও পেরিয়ে যায়। ধর্ষণ মামলায় মেডিক্যাল প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ। ভুক্তভোগীর শরীরে যৌন নির্যাতনের আলামত, আঘাতের চিহ্ন, ডিএনএ নমুনা এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য যাচাইয়ের জন্য এ প্রতিবেদন প্রয়োজন।
রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানায় গত বছরের ৮ এপ্রিল এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন তার বাবা। এজাহারে বলা হয়, সাততলা বাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবক তাঁর মেয়েকে কৌশলে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও পিরোজপুরে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করে। ছয় দিন পর পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধারের পর প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে। পরে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের অনুমতি নিয়ে ডিএনএ নমুনার সঙ্গে গ্রেপ্তার আসামির ডিএনএ তুলনামূলক পরীক্ষা করান। কিন্তু মেডিক্যাল প্রতিবেদন ও ডিএনএ প্রতিবেদন না পাওয়ায় তদন্তও শেষ হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সংগঠন দ্য মেডিকোলিগ্যাল সোসাইটির সহসভাপতি অধ্যাপক মোস্তাক রহিম স্বপন প্রথম আলোকে বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তাগাদা দিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। সময়মতো প্রতিবেদন পাওয়া না গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে।
আইন কী বলে
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬)-এ তদন্তের সময়সীমা ১৫ কার্যদিবস বেঁধে দেওয়া আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে।
মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ধর্ষণের ধারায় উল্লেখযোগ্য কিছু সংশোধন আনে।
আইনে ভুক্তভোগী ও আসামির ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে বলা হয়েছে, আদালত যদি মনে করেন ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মেডিক্যাল সনদ দিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করা যাবে, তাহলে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে না। ধর্ষণের (৯ খ বাদে) ঘটনার তদন্ত ও বিচারের সময় অর্ধেক করা হয়েছে। তদন্ত হবে ১৫ দিনে ও বিচার হবে ৯০ দিনে। তবে বিচারক মনে করলে সময় বাড়াতে পারবেন।
দ্রুত তদন্তে করণীয়
ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নিয়ে আইন বিশ্লেষণ ও গবেষণা করছেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম। দ্রুত তদন্ত বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার রাতে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসামি ধরা পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার তদন্তকাজ শেষ করতে হবে। আর আসামি আইনের আওতায় আনা না গেলে ধর্ষণের মামলার তদন্ত ৩০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
ফউজুল আজিম মনে করেন, ধর্ষণ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার জন্য নারী চিকিৎসকের বিশেষ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাকে শুধু ধর্ষণের মামলা তদন্ত ছাড়া অন্য কোনো কাজ করানো যাবে না। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তদন্তের জন্য পর্যাপ্ত খরচ দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা ও ফরেনসিক প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা, ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রতিবেদন দ্রুত তৈরি করতে হবে উল্লেখ করে সাবেক এই জেলা জজ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাকে তৎপর থেকে প্রতিবেদনগুলো সংগ্রহ করতে হবে। সব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে নির্ধারিত সময়ে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতার খবর ‘তিন দলের ‘মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ’: সুযোগ নিচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের রাজনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসেনি। বরং আধিপত্য বিস্তারসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে ‘বৈরিতা’ দেখা যাচ্ছে। আর তিনটি দলের এই বিরোধ বা অনৈক্যের সুযোগ নিতে চাইছে রাজনীতির মাঠ থেকে ছিটকে পড়া দল আওয়ামী লীগ। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচন থেকে বাইরে এবং সাংগঠনিকভাবে এলোমেলো অবস্থায় থাকলেও দলটি একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছে। উদ্দেশ্য হলো-ওই সুযোগে তারা যাতে দেশে ঢুকে পড়ে রাজনীতির মাঠ দখল করতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও নেপথ্যে থেকে নানা ইস্যুকে উসকে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়েছে।
নানা সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, এরপর দলটির প্রত্যাশা ছিল, কোনো-না-কোনোভাবে তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। কিন্তু অধ্যাদেশ জারি করে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি দলটি। নির্বাচনের পর দলটির প্রত্যাশা ছিল, ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার অন্তত তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দেবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ সংসদে পাশ করে আইনে পরিণত করায় রাজনীতিতে ফেরার আশা দলটির আরও কমে যায়। সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এসব কারণে তারা এখন বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা দেখতে আগ্রহী। পাশাপাশি তারা চায়, তিন দলের মধ্যে বিরোধের সূত্র ধরে একটা গোলযোগ তৈরি হোক। কারণ, এমন গোলযোগ বা সংঘাতের সুযোগে তারা দেশের ঢুকে পড়তে পারবে বলে মনে করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলামের মতে, জুলাই মুভমেন্টে যারা ছিল, তাদের মধ্যে যখন ফাটল দেখা দেবে, তখনই তৃতীয় কোনো দল কিংবা আওয়ামী লীগ সুযোগটা নেবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন জায়গায় মাঝেমধ্যে আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং হচ্ছে। এটা বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ঐক্যের ফাটলের অংশ। তাই জাতীয় স্বার্থে দলগুলোকে পরস্পরবিরোধী অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সংবিধান সংস্কারসহও বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্যের অভাব দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের প্রতিনিধিত্বকারী দল এনসিপি। বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই দলগুলোর মধ্যে সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং বিগত সরকারের আমলানির্ভর সিন্ডিকেট ভাঙার মতো মৌলিক ইস্যুতে দলগুলো একক সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। বরং বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা অব্যাহত রেখেছে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির রাজনৈতিক ঐক্য থাকলেও অনেক ইস্যুতে এ দল দুটির মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক দল হিসাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ বর্তমানে মাঠের রাজনীতিতে পুরোপুরি কোণঠাসা। তবে দলটির একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ‘চোরাগুপ্তা’ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যবর্তী বিরোধকে আরও উসকে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এমনকি রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায়ই দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলার মতো সাহসও দেখাচ্ছেন তারা।
কয়েকদিন আগে নোয়াখালীতে বড় একটি ঝটিকা মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। ৭ জুন কুমিল্লার সদর দক্ষিণ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করেন। একই সময়ে ঝিনাইদহ ও ময়মনসিংহের ভালুকায় ঝটিকা মিছিল করেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া ৩ জুন গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীতে এবং ৬ জুন চট্টগ্রামে তাদের মিছিল করার খবর পাওয়া যায়।
কালের কণ্ঠ
‘সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী। সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল আরো বলেন, বাজেটের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চলতি জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আরো জানান, নির্বাচনী ব্যয় নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনকে এরই মধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলে স্থানীয় সরকার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নেবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে সরকার স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের লিখিত উত্তরে মন্ত্রী জানান, স্বল্পমেয়াদি কার্যক্রমের আওতায় নর্দমা, বক্স-কালভার্ট ও খাল থেকে পলি ও বর্জ্য অপসারণ, পোর্টেবল পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন, বিদ্যমান পাম্প স্টেশন পরিচালনা, ক্যাচপিট ও গ্রেটিংস স্থাপন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ওয়ার্ডভিত্তিক জরুরি সাড়া প্রদানকারী দল গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় খাল পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি বড় খালের উন্নয়ন কাজ চলছে। জিয়া সরণি ও শ্যামপুর খালের পানি বুড়িগঙ্গা নদীতে নিষ্কাশনের জন্য আউটলেট নির্মাণ এবং ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও চলমান রয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জিয়া সরণি, কাজলা ও মৃধাবাড়ি খালসহ প্রায় ৫০ কিলোমিটার খাল উন্নয়ন, নব সংযুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডে ড্রেনেজ ও সড়ক উন্নয়ন, অতিরিক্ত আউটলেট ও পাম্প স্টেশন নির্মাণ এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরো আধুনিক ও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘ব্যাংকে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক খাতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ আরও বেড়েছে। মূলধন ঘাটতি নেমেছে ঋণাত্মক ধারায়। গত বছর রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিলের পরও বেশির ভাগ সূচকের অবনতি হয়েছে। বছর শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত বার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫ থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।
ব্যাংক খাতের আদায় অনিশ্চিত উচ্চ ঝুঁকির ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত তথা ডিসট্রেস অ্যাসেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বলতে ব্যাংক খাতের দেখানো মোট খেলাপি ঋণ, পুনঃতপশিল করা ঋণের অনাদায়ী অংশ এবং অবলোপন করে আলাদা করে রাখা অনাদায়ী ঋণ স্থিতির যোগফলকে বোঝানো হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান ৫৫০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত মেনে ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিবছর এ ধরনের ঋণ বাড়ছে। এর আগে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেড়েছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা।
মূলত এসব ঋণ অনাদায়ী। তবে নানা উপায়ে নিয়মিত দেখানো হতো। কিছু ঋণ অবলোপনের মাধ্যমে ব্যালান্স শিট বা আর্থিক হিসাব বিবরণী থেকে আলাদা রাখা হয়। এ ধরনের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম। যে কারণে এসব ঋণকে দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন ঘাটতি ঋণাত্মক চলে গেছে। ব্যাংকগুলোর মোট ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের যেখানে সাড়ে ১২ শতাংশ ধনাত্মক রাখার কথা, সেখানে উল্টো ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ ঋণাত্মক রয়েছে। আগের বছর শেষেও প্রয়োজনের তুলনায় মূলধন অনেক কম ছিল। তবে তা ছিল ইতিবাচক ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। মূলত ২০টি ব্যাংকের ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির প্রভাবে পুরো খাত এ পরিস্থিতিতে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকায়। এর মধ্যে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। পুনঃতপশিলের পর অনাদায়ী রয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। আর অবলোপন করা অনাদায়ী স্থিতি রয়েছে ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এক বছর আগে মোট ঋণ স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে পুনঃতপশিল করা অনাদায়ী ঋণ তিন লাখ ৪৮ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ছিল তিন লাখ ৪৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া অবলোপন করে অনাদায়ী ঋণ স্থিতি বেড়ে ২০২৪ সাল শেষে ৬২ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ওই সময় পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের যা ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা বা ৪৪ দশমিক ২১ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্দশাগ্রস্ত এসব ঋণের বড় অংশই আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সৃষ্ট। তবে ওই সময় এসব ঋণ কৌশলে নিয়মিত দেখানো হতো। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করে। এদিকে অনিয়ম-জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অনেকেই পালিয়েছেন। কেউ কেউ কারাগারে। ব্যবসায়ীদের খুশি করতে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগ থেকে একের পর এক সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। কখনও নামমাত্র ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতপশিল, কখনও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় ১২ বছরের জন্য ঋণ নবায়ন কিংবা পুনর্গঠন করা হয়। তবে সেসব ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। অবশ্য অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পর গত বছর শেষদিকে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়।
ইত্তেফাক
‘চট্টগ্রামের আনোয়ারায় হবে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামোর উন্নয়নসহ পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একনেক চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত চলতি অর্থবছরের ১৩তম একনেক সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে নতুন তিনটি এবং সংশোধিত দুইটি রয়েছে।
সভা শেষে রাজধানীর আগারগাস্থ এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, পরিবেশগত সমস্যা সমাধান এবং প্রকল্পের নকশায় টেকসই জ্বালানি সমাধান অন্তর্ভুক্ত করার শর্তে ‘চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্প’ অনুমোদন করা হয়। চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে সবুজ ও টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একনেক সভায় ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘সাপোর্টিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট ফর চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ব্যয়ের মধ্যে মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল হতে ১৭২২ কোটি ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বাকি ২৪৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে।
প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানান, প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা আরো জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাসমূহকে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তিনি আধুনিক পরিবেশগত মান ও প্রটোকল অনুসরণ করে শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দেন। একটি আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিশোধনের পর শোধিত পানি যেন পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা হয়। তিনি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের ত্রুটিগুলো দূর করে প্রকল্প নকশায় কোনো পরিবেশগত ঘাটতি যাতে না থাকে তা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। এছাড়া প্রকল্পে সৌরভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পুরো শিল্পাঞ্চলে সৌর প্যানেল স্থাপনেরও নির্দেশনা দেন তিনি। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি শোধন ও পুনর্ব্যবহার সুবিধা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সংযুক্তি সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের শর্তে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। বেজা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ১,২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, ১,১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০,৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বহুমুখী জেটি, ৬০ টন দৈনিক সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কটে তরুণ প্রজন্ম’। খবরে বলা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। কিন্তু দেশের এই মূল চালিকাশক্তি আজ এক অদৃশ্য অথচ বিধ্বংসী সঙ্কটের মুখোমুখি, যার নাম মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (এনআইএমএইচ) বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশই তরুণ প্রজন্ম।
উদ্বেগজনক এই বাস্তবতার বিপরীতে দেশের চিকিৎসা অবকাঠামোর চিত্রটি চরম সঙ্কটাপন্ন। তীব্র জনবল সঙ্কট, অপর্যাপ্ত বাজেট এবং বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে আক্রান্তদের ৯২ শতাংশেরও বেশি মানুষ কোনো ধরনের চিকিৎসার আওতায় আসছেন না।
ডিজিটাল আসক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান বলেন: পাবজি বা ফ্রি ফায়ারের মতো গেমসগুলো আমাদের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে চরম আগ্রাসী মনোভাব তৈরি করছে। একটি কেস স্টাডিতে দেখা গেছে, নবম শ্রেণীর এক ছাত্র গেমের প্রভাবে কাল্পনিক জগতে বসবাস করতে শুরু করেছে এবং নিজের চারপাশের মানুষের সাথে বিরোধপূর্ণ আচরণ করছে। ডিজিটাল আসক্তির কারণে অনেক শিশু ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে এমনভাবে ডুবে থাকে যে তারা বাস্তব জগতের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলছে।
তিনি আরো জানান, ইন্টারনেট আসক্তিকে এখন আন্তর্জাতিকভাবে (ডিএসএম-৫) একটি রোগ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোরী বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে তারা বেশি বিষণ্ণতায় ভোগে। কারণ, তারা অন্যদের পোস্ট করা কৃত্রিম সুখী জীবনের সাথে নিজেদের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে শুরু করে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) মানুষের মস্তিষ্কের ‘প্লেজার সেন্টার’ বা ডোপামিন নিঃসরণকে এমনভাবে উদ্দীপিত করছে, যাতে মানুষ দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে আটকে থাকে।
বণিক বার্তা
‘ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা এখন ঋণাত্মক’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার পরিমাপ হলো তার মূলধন পর্যাপ্ততা। এটি নির্দেশ করে যে ব্যাংকটি সম্ভাব্য ব্যবসায়িক ঝুঁকি (যেমন খেলাপি ঋণ) মোকাবেলা করতে সক্ষম কিনা।
মূলধন পর্যাপ্ততা বা সিআরএআর হলো ব্যাংকের মূলধন এবং তার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত। বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাসেল থ্রি অনুযায়ী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সিআরএআর পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। এর উদ্দেশ্য আমানতের অর্থ সুরক্ষিত রাখা, ব্যাংককে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচানো।
বাংলাদেশে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে চর্চিত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। কার্যকর অর্থনীতির কোনো দেশের ব্যাংক খাতের গড় মূলধন ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আধুনিক বিশ্বের বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের মূলধন সক্ষমতা ঋণাত্মক ধারায় চলে গেলেও এ সময়ে আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়েছে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার ব্যাংকগুলো। পাকিস্তানের ব্যাংক খাতে সিআরএআর এখন প্রায় ২১ শতাংশ। আর শ্রীলংকায় ১৯ শতাংশেরও বেশি। প্রতিবেশী ভারতের ব্যাংকগুলোর গড় সিআরএআর ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ বলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫-এ তুলে ধরা হয়েছে। যদিও মাত্র তিন বছর আগেও অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়াত্বের মুখে পড়েছিল শ্রীলংকা ও পাকিস্তান। ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়েছিল দেশ দুটি।
মূলধন পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে কোনো ব্যাংকের দেউলিয়াত্বের নির্দেশক ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় দুই ডজন ব্যাংক এখন মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে এ ঘাটতিও সঞ্চিতি সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি ছাড়ের বদান্যতায় হয়েছে। এক্ষেত্রে নীতি ছাড় দেয়া না হলে দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঘাটতি কয়েক গুণ বেড়ে যেত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোনো দেশের ব্যাংক খাতের সম্মিলিত সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে বিরল ঘটনা বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকও। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আধুনিক বিশ্বের আর কোনো দেশের ব্যাংক খাতের সিআরএআর ঋণাত্মক ধারায় থাকার কথা নয়। সে অর্থে বাংলাদেশের উদাহরণটি বিরল বলা যেতেই পারে। কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির সূত্রপাত হয় প্রভিশন ঘাটতি থেকে। আর প্রভিশন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক আকারে বেড়ে গেলে। দেশের ব্যাংক খাতে এখন যে খেলাপি ঋণ দেখা যাচ্ছে, সেটি কোনো ব্যাংকিংয়ের ফল নয়। বরং এটি ঋণের নামে ব্যাংক লুটের বহিঃপ্রকাশ।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে দেশের কিছু ব্যাংকে ঋণের নামে যে জালিয়াতি হয়েছে, সেগুলোকে কোনো অর্থেই ব্যাংকিং বলা যায় না। এটিকে লুট বলা যেতে পারে। এ ঋণ যারা নিয়েছে, তারা ঋণগ্রহীতা নয়, বরং লুটেরা। লুট হয়ে যাওয়া ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের জন্য আমরা টাকা ছাপিয়ে ধার দিতে বাধ্য হচ্ছি। কিন্তু এভাবে তো দীর্ঘদিন চলা যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিও জিম্বাবুয়ে কিংবা আর্জেন্টিনার পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।’
দেশের আর্থিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি ও স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন করে প্রতি বছর ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট’ প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্রতিবেদনের সর্বশেষ সংস্করণে দেখা যায়, ২০২৩ সাল শেষেও বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিআরএআর ছিল ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সাল শেষে এ হার এক ধাক্কায় ৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে নেমে যায়। আর গত বছর (২০২৫ সাল) শেষে সিআরএআর ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসে।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা দেড় দশকে বেড়ে ৯ গুণ’। খবরে বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামের আলোচিত, বিতর্কিত ব্যবস্থাটি। চুক্তির মধ্য দিয়ে আপাত-নিয়মতান্ত্রিকভাবে হলেও পর্যবেক্ষকেরা এ ব্যবস্থাকে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সরকারের ওপর বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিশোধ করা ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত দেড় দশকে এ বাবদ খরচ বেড়েছে ৯ গুণ। আর এর চাপ এসে পড়ছে ভোক্তার ঘাড়েও।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্থ উপার্জনের মূল উপায় বিদ্যুৎ বিক্রি করা। সেহেতু তাদের যেন ক্ষতি না হয়, তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বন্ধের সময়ের জন্যও পিডিবিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে একটি চার্জ দিতে হয়। চুক্তির সময় এটি নির্ধারণ করা থাকে। বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে দেওয়া এই অর্থই হলো ক্যাপাসিটি চার্জ।
পিডিবি বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়ে আগে বলেছে, তারা হিসাব করে যখন দেখে, ডিজেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়াই বেশি সাশ্রয়ী, তখন ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কার্যত সরকার ও জনগণের জন্য বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ টাকা পরিশোধ করে যেতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি মিলিয়ে মোট ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দেশের শতভাগ এলাকা বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসার পরও চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উঠছে না। অন্যদিকে গড়ে দৈনিক ১২ হাজার মেগাওয়াট হারে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্যুতের গড় উৎপাদনের দ্বিগুণের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে রাখা হয়েছে।
সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জের বিধান নেই। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে বিদ্যুৎ জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ আইন করে। এর আওতায় যেসব বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়, সেগুলো বসিয়ে রাখলেও উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকঋণের সুদ, পরিচালন ব্যয়, কেন্দ্রের দক্ষতাসহ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করে বিদ্যুতের একক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বর্তমানে দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। আর সরকারি কেন্দ্র রয়েছে ৫৫টি, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার ৭৫৮ মেগাওয়াট। হিসাবের বাকি বিদ্যুৎ আসে ভারত ও নেপাল থেকে।
২০২৩ সালের নভেম্বরে তখনকার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, আগের ১৪ বছরে ৮২টি বেসরকারি এবং ৩২টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে সরকার।
বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বিষয়টি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনকারীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে আসছে।
দেশ রূপান্তর
‘সরকারের চোখ নেই চা বাগানের জমিতে’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্ধেকের বেশি জ্বালানি আমদানি করা হয়। বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি আমদানি প্রায়ই বিঘ্নিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট কাটিয়ে ওঠার অন্যতম পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার। জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমূল্য ও ঘাটতির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের টেকসই ও সাশ্রয়ী বিকল্প হলো সৌরবিদ্যুৎ। এটি লোডশেডিংয়ের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা হ্রাস করে এবং পরিবেশবান্ধবও। এ জন্য সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণ জমির সংস্থান করা দুরূহ। এক্ষেত্রে চা বাগানের হাজার হাজার একর অব্যবহৃত জমি এর বিকল্প হতে পারে। কিন্তু চা বাগানের এই জমিতে চোখ নেই সরকারের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা বাগানের অব্যবহৃত জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিনামূল্যে দিলে অন্তত ২০ শতাংশ উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। এর সঙ্গে সরকারি খরচে সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গ্রিড পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন এবং সাবস্টেশন নির্মাণ করে দেওয়া হলে এই খরচ আরও ১০ শতাংশ কমানো সম্ভব। দেশে জমি ও গ্রিড লাইনসহ সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলে ইউনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ ৭ সেন্ট পড়বে। আর সরকার জমি ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করে দিলে তা ৫ দশমিক ২০ সেন্টে নামিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২৫ টাকা বিনিময় হার নির্ধারণ করলে তা ৬ দশমিক ২৫ টাকার সমান। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বলছে, বর্তমানে দেশে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ গড়ে ১২ টাকা ৯১ পয়সা। এই প্রক্রিয়ায় সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের সাশ্রয় হবে ৬ টাকা ৬৬ পয়সা।
সৌরবিদ্যুতে ভারত মডেল: ভারতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জমি দেওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোও নির্মাণ করে দেয় সরকার। যদিও বাংলাদেশে গড়ে দিনে সাড়ে চার ঘণ্টা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। ভারতে এই হার রাজ্যভেদে ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট আড়াই রুপিতে নেমে এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা সাড়ে তিন টাকার মতো।
বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় নামছে ৭ সেন্টে: রাষ্ট্রীয় নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি সম্প্রতি পদ্মা সোলার প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করেছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, তাদের সর্বোচ্চ ব্যয় ইউনিটপ্রতি ৭ সেন্ট হতে পারে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পদ্মা সেতুর অব্যবহৃত জমি লিজ নিয়ে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে এখানেও জমিটি বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন অবকাঠামোতে সরকার বিনিয়োগ করে দামের একটি মানদ- নির্ধারণ করতে পারত। কেন্দ্রটির সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণে কোম্পানিটির ১৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে এটি এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন ব্যয়ের প্রকল্প।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘নিয়ন্ত্রণে আসছে না আইনশৃঙ্খলা’। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিশেষ অভিযানেও লাগাম টানা যাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের। খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, মব, ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্রের মহড়া, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আধিপত্যের লড়াই ও অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। অপরাধীদের হাতে আক্রান্ত হচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও। এতে পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা আরও তীব্র হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বয়ং পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের দাবি, মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দিনদিন বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কোথাও কঠোর অবস্থানে গেলে ফ্যাসিস্ট আমলের পুলিশ ট্যাগ দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ কারণে অনেকটা নড়বড়ে পুলিশিং চলছে সারা দেশে। আর এ সুযোগটা নিচ্ছে অপরাধীরাও।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সরকারের সদিচ্ছার সমন্বয়, সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের আইন মেনে চলতে বাধ্য করা ও মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারলে একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু এ জায়গাগুলোতে অনেক ঘাটতি রয়েছে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু সেটি স্থিতিশীল হচ্ছে না। ১৬-১৭ বছরের নির্যাতনের উদাহরণ টেনে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা প্রতিশোধপরায়ণ হচ্ছেন। অপরাধ অর্থনীতিতে আধিপত্যের লড়াই চলছে। সাধারণ মানুষও আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। পুলিশ আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারকেই আরও কঠোরভাবে উদ্যোগী হতে হবে, যাতে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আইন মেনে চলে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে (মার্চ-মে) দেশে ৯১৫ হত্যা, ৪৬১ ছিনতাই, ১৩২ ডাকাতি, ২৮৬ অপহরণ, ২ হাজার ৪৬৬ চুরি ও ৩৯৬টি অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে। ওই তিন মাসে পুলিশের ওপর হামলা ঘটেছে ১৮৪টি। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, মে মাসে মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন ও আহত হন ৬৮ জন। ৬৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর তিনটি হামলায় পাঁচজন আহত হয়েছেন। ছয়টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং একটি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। ৩০৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ৭৬ নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৭ নারী ও শিশু। আইনশৃঙ্খলা বিপর্যয়ের সবশেষ চিত্র ফুটে উঠেছে গতকাল ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের অভিযানে গিয়ে চাপাতির কোপে রাজধানীর আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম ও এসআই তরুণ আহত হওয়ার ঘটনায়। রাজধানীর অন্যতম অপরাধপ্রবণ এ এলাকাটিতে অপরাধীদের হামলা নিয়ন্ত্রণে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে দুই ছিনতাইকারী আহত হন। গুলিশের ওপর হামলার আগে ছিনতাইকারী চক্রটি চাপাতি ঠেকিয়ে এক দোকান থেকে ছিনতাইও করে। এর আগে নারায়ণগঞ্জ, সুন্দরবনসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলার শিকার হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এদিকে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ও খুনাখুনিও উদ্বেগ ছড়াচ্ছে জনমনে। চলতি বছরের এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি ২০৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর চট্টগ্রামে ১৮৬, রাজশাহীতে ১০৬ ও খুলনায় ৮৪টি মামলা হয়েছে। মেট্রোপলিটনের মধ্যেও শীর্ষে ঢাকা। শুক্রবার ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। একই দিন খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রবিবার খুলনা শহরের দৌলতপুরে ফজর নামাজের সময় মসজিদের ভিতর সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।
শনিবার চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার এক জনাকীর্ণ বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যার সিসিটিভি ফুটেজ সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পাঁচ-সাতজনের সশস্ত্র সন্ত্রাসীর গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতাকেই দায়ী করেন সবাই। এর আগে রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুন ও টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
