বিশ্বকাপের মঞ্চ সব সময়ই বড় খেলোয়াড়দের আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। অনেক তারকা ক্লাব ফুটবলে উজ্জ্বল থাকেন। কিন্তু বিশ্বকাপের আলোয় এসে ম্লান হয়ে যান। আবার কিছু ফুটবলার আছেন যারা এই মঞ্চকে নিজের করে নেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে সেই বিরল শ্রেণির একজন। সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের ৩-১ গোলের জয় ছিল শুধু একটি ম্যাচ জয় নয়। এটি ছিল শক্তি প্রদর্শনের এক স্পষ্ট ঘোষণা। প্রথমার্ধে সেনেগাল ছিল সাহসী। তারা সুযোগ তৈরি করেছে। আক্রমণে গতি দেখিয়েছে। এমনকি কয়েকবার ফরাসি সমর্থকদেরও উদ্বেগে ফেলেছিল। কিন্তু বড় দলের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা প্রতিকূল সময় পার করে নিজেদের সেরা রূপে ফিরে আসতে জানে।
বিরতির পর সেই চেনা ফ্রান্সকে দেখা গেল। মাঠের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে এলো। পাসিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাস। আক্রমণে ছিল ধার। আর সামনে ছিলেন এমবাপ্পে। মহান খেলোয়াড়দের সম্পর্কে একটি কথা প্রায়ই বলা হয়। তারা ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। এমবাপ্পে ঠিক সেটিই করেছেন। তাঁর প্রথম গোলটি ছিল নিখুঁত সময়জ্ঞান ও ফিনিশিংয়ের উদাহরণ। দ্বিতীয় গোলটি ছিল শিল্প। এমন গোল ফুটবলপ্রেমীদের শুধু আনন্দই দেয় না। দীর্ঘদিন মনে থাকার মতো স্মৃতিও তৈরি করে। এই ম্যাচে এমবাপ্পের অর্জন আরও বড়। তিনি ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠে গেছেন। ৯৯ ম্যাচে ৫৮ গোল নিঃসন্দেহে অসাধারণ কীর্তি। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো তাঁর বয়স এখনো মাত্র ২৭ বছর। অর্থাৎ সামনে রয়েছে আরও অনেক বছর। আরও অনেক ম্যাচ।
আরও অনেক রেকর্ড। অলিভিয়ের জিরু ফরাসি ফুটবলের একজন কিংবদন্তি। তাঁর মতো একজন খেলোয়াড় যখন প্রকাশ্যে এমবাপ্পের প্রশংসা করেন তখন সেটি বিশেষ অর্থ বহন করে। জিরুর বিশ্বাস এমবাপ্পে একদিন ১০০ আন্তর্জাতিক গোলের মাইলফলক স্পর্শ করবেন। বর্তমান ফর্ম দেখলে সেই বিশ্বাসকে অযৌক্তিক মনে হয় না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডও এখন এমবাপ্পের নাগালের মধ্যে। তাঁর সামনে রয়েছে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা। তবে রেকর্ডের চেয়েও বড় বিষয় হলো তিনি দলকে কী দিচ্ছেন। এই ম্যাচে তিনি শুধু গোল করেননি। তিনি আত্মবিশ্বাস দিয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুরো দলকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ থেকে সাধারণ সমর্থক সবাই আজ গর্বিত। কারণ তারা দেখছেন এমন একজন ফুটবলারকে যিনি শুধু প্রতিভাবান নন। তিনি ধারাবাহিকও। বড় ম্যাচে নিজেকে প্রমাণ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। ফ্রান্সের জন্য এই জয়ের আরেকটি তাৎপর্য আছে। অনেকেই মনে করেছিলেন দলটি হয়তো আগের মতো ভয়ংকর নেই। কিন্তু সেনেগালের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধের ফুটবল সেই ধারণা বদলে দিয়েছে।
ফ্রান্স দেখিয়েছে তারা এখনো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর দল। তাদের স্কোয়াডে আছে গভীরতা। আছে অভিজ্ঞতা। আছে তরুণদের উদ্দীপনা। আর আছে এমবাপ্পের মতো ম্যাচ জেতানো তারকা। বিশ্বকাপের পথ দীর্ঘ। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। কিন্তু শুরুটা যেমন হয়েছে তাতে ফ্রান্সকে শিরোপার অন্যতম দাবিদার বলতেই হয়। তারা সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দল নয়। তারা ট্রফির দিকে তাকিয়ে থাকা একটি পরিণত শক্তি। আর এমবাপ্পে? তিনি যেন নিজের গল্প নিজেই লিখে চলেছেন। প্রতিটি ম্যাচে নতুন অধ্যায় যোগ করছেন। ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরের দিকে তাঁর যাত্রা অব্যাহত আছে। বিশ্বকাপের এই মঞ্চে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন, মহান খেলোয়াড়রা শুধু ম্যাচ জেতেন না। তারা যুগের পরিচয় হয়ে ওঠেন।
