প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রপ্তানির ক্ষেত্রে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বিদ্যমান বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়ার উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বস্ত্র, অ্যাকসেসরিজ ও প্যাকেজিং খাতের উদ্যোক্তারা। তাদের মতে, সম্প্রতি ঘোষিত আমদানি নীতির পর বাজেটের এই প্রস্তাবও ধীরে ধীরে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত দুর্বল করছে, যা দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, আমদানি নীতিতে মূল্য সংযোজনের বিদ্যমান বাধ্যবাধকতা প্রয়োজনের চেয়ে কম রাখার পর প্রস্তাবিত বাজেটে আরও শিথীল করায় স্থানীয় শিল্পের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো বাজারে বর্তমানে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বিদ্যমান।
এই শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হলে সেই রপ্তানিকে “ট্রান্সশিপমেন্ট” হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এজন্য সেই রপ্তানিকারককে গুনতে হবে অতিরিক্ত শুল্ক।
উদ্যোক্তারা বলছেন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হলে স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে। ফলে সুতা, কাপড়, অ্যাকসেসরিজ, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন সহায়ক শিল্পের চাহিদা কমে যাবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
তাদের দাবি, সাম্প্রতিক আমদানি নীতিতে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ ও মূল্য সংযোজন সম্পর্কিত কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বাজেটের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দেশীয় শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত তুলে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান আটটি খাতের পাশাপাশি আরও ১০টি খাতকে এই সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা দিতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এতে স্থানীয় কাঁচামালের পরিবর্তে আমদানিকৃত কাঁচামাল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়বে এবং দেশীয় শিল্পগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
এনজেড টেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক সহ-সভাপতি মো. সালেহুদ্দিন জামান খান বলেন, বছরের পর বছর ধরে নীতিগত সহায়তা ও মূল্য সংযোজনের শর্তের মাধ্যমে দেশে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব শর্ত তুলে দিলে সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, মূল্য সংযোজনের ন্যূনতম শর্ত না থাকলে রপ্তানিকারকরা খুব সামান্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্য পুনরায় রপ্তানি করতে উৎসাহিত হতে পারেন, যা দেশের প্রকৃত রপ্তানি আয় ও শিল্পায়নের লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল্য সংযোজনের শর্ত শুধু রপ্তানি আয়ের বড় অংশ দেশেই ধরে রাখতে সহায়তা করে না, বরং সুতা, কাপড়, প্যাকেজিং সামগ্রী, অ্যাকসেসরিজসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহকারী হাজারো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসাও টিকিয়ে রাখে।
তারা আরও বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্ক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘রুলস অব অরিজিন’ এবং স্থানীয় মূল্য সংযোজনের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে এখনই মূল্য সংযোজনের শর্ত শিথিল করা দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের উচিত দেশীয় শিল্পভিত্তি ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় এমন নীতি সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে না।
বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বিদ্যমান মূল্য সংযোজনের শর্ত বহাল রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি তুলে দেয়া হলে দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে এবং শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধার অপব্যবহারের সুযোগ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যখন ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন, ঠিক সেই সময়ে মূল্য সংযোজন শর্ত শিথিল করা দেশীয় শিল্পের জন্য ধ্বংসাত্মক হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজেটের এই প্রস্তাবে সংশোধনী আনা না হলে দেশীয় শিল্প এবং তাদের অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণ ব্যাহত হবে বলেও তিনি মনে করেন।
