যশোরের চৌগাছায় গ্রেপ্তারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমানসহ ৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সাক্ষ্য দিয়েছেন ভুক্তভোগী মো. ইসরাফিল হোসেন। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার সময় ইসরাফিল তার কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া বাম পা প্রদর্শন করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সাক্ষ্য শেষে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৫শে জুন দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে ইসরাফিল হোসেন বলেন, ২০১৪ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের যশোর জেলার চৌগাছা থানার সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এ কারণে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার তাকে খুঁজে তার পরিবারের সদস্যদের গুম ও ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়।
তিনি জানান, ২০১৬ সালের ৩রা আগস্ট সাংগঠনিক কাজ শেষে বন্ধু রুহুল আমিনকে নিয়ে মোটরসাইকেলে চৌগাছার নারায়ণপুরে যাওয়ার পথে কন্দলীতলা এলাকায় পুলিশ তাদের আটক করে। তাদের কাছে থাকা একটি বাইতুল মাল আদায়ের রশিদ বই ও কয়েকটি দলীয় বই জব্দ করে থানায় নেওয়া হয়। সেখানে ওসি মশিউর রহমানের কক্ষে রাতভর চর-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, লাঠিপেটা ও বুট দিয়ে লাথি মেরে নির্যাতন করা হয়। সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের একপর্যায়ে ভিডিও কলে তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানকে দেখিয়ে ওসি বলেন, “স্যার, আপনার নির্দেশনামতে এই দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছি।” জবাবে এসপি নাকি বলেন, “সকালে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও, পরে আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবা।”
ইসরাফিল আরও দাবি করেন, পরদিন ডিবি অফিসে নেওয়ার পর এক কর্মকর্তা তাদের জানান যে, রাতে তাদের ‘ক্রসফায়ার’ দেওয়া হবে। এরপর ৪ঠা আগস্ট রাতে হাতকড়া ও চোখ বেঁধে বন্দলীতলা মাঠের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে রুহুল আমিনকে এবং পরে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর পুলিশ তার ক্ষতস্থানে ধুলাবালি ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে দেয়। পরে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হয়ে যশোর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলেও দুই দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তার বাম পা হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয়।
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার সময় ইসরাফিল তার কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া বাম পা প্রদর্শন করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেও পুলিশ তাদের আবার গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে। পরে ৩৩ দিন কারাভোগের পর তারা জামিনে মুক্তি পান। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, জেলখানায় গিয়ে একই ধরনের গুলিবিদ্ধ ও পঙ্গু হওয়া আরও বহু ব্যক্তিকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে যশোর শহরের আল-মুসাইব ও সোলাইমান, ঝিকরগাছার রুহুল আমিন, মনিরুল ও মনিরুজ্জামান এবং বেনাপোলের আবুল কাশেম, বুলবুল ও আলী হায়দারের নাম উল্লেখ করেন।
সাক্ষী তার পুরো ঘটনার জন্য তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিবুল ইসলাম, এএসআই মাজেদ, কনস্টেবল সাজ্জাদ ও কনস্টেবল জহুরুলসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করেন। তিনি আরও জানান, তদন্ত কর্মকর্তার কাছে ২০১৬ ও ২০১৮ সালে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদন জমা দেন, যা জব্দতালিকার মাধ্যমে আলামত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন অনলাইন ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমেও তাদের গুলিবিদ্ধ করার ঘটনা প্রকাশিত হয়েছিল এবং মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। মামলার শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২৫ জুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
