‘দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ, তবুও গুলি’; ভিডিও-সাক্ষ্য-প্রমাণে পুলিশের দায় প্রতিষ্ঠিত, ট্রাইব্যুনালের পূর্ণাঙ্গ রায়ে গুরুত্বপূর্ণ এসব পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে রংপুর আদালতে স্থগিত হওয়া মামলাগুলো চালিয়ে যেতে পূণাঙ্গ রায়ে অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মোট ৮০৯ পৃষ্ঠার এই রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে অ-আক্রমণাত্মক অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং সেই অবস্থাতেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে আদালত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে ভিডিও ফুটেজের উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে। আদালতের মতে, এসব ডিজিটাল প্রমাণ সাক্ষীদের বক্তব্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে এবং ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে আরও বলেছে, কোনো বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি কেবল উপস্থিত থাকার কারণে আক্রমণকারী বা যোদ্ধায় পরিণত হন না। আবু সাঈদের আচরণ ছিল সম্পূর্ণ অ-আক্রমণাত্মক এবং তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।
রায়ে গুলি চালানোর দায় শুধু অস্ত্রধারী ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। আদালত বলেছে, যারা নির্দেশ দিয়েছেন, অভিযান পরিচালনা করেছেন বা কমান্ডের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ভূমিকাও সমানভাবে বিচারযোগ্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের আলোকে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও সহযোগিতার বিষয়গুলোও দায় নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সাক্ষ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে ছোটখাটো অসঙ্গতি থাকলেও তা তাদের মূল সাক্ষ্যকে অবিশ্বাস্য করে তোলে না। বরং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এ ধরনের পার্থক্য স্বাভাবিক এবং সামগ্রিকভাবে সাক্ষ্যগুলো নির্ভরযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
রায়ে আরও উঠে এসেছে সুরতহাল প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন। সুরতহাল প্রস্তুতকারী এক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, গুলির আঘাতের বিষয়টি উল্লেখ না করার জন্য তার ওপর চাপ ছিল। যদিও এ অভিযোগ আদালত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছে, তবুও সুরতহালের সীমাবদ্ধতা আবু সাঈদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বাস্তবতাকে নাকচ করতে পারে না বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আহত আবু সাঈদকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষ্যকেও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের বর্ণনা ঘটনাপ্রবাহের ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ (Joint Criminal Enterprise) নীতিরও আলোচনা রয়েছে। আদালত বলেছে, শুধু সরাসরি গুলি চালানো নয়, বরং পরিকল্পিত অপরাধে জেনে-শুনে অংশগ্রহণ, সহযোগিতা বা উৎসাহ প্রদানও দায় সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে রায়ের শেষাংশে ট্রাইব্যুনাল আগে জারি করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে তাজহাট থানার সংশ্লিষ্ট সাধারণ ফৌজদারি মামলাগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালানোর পথ খুলে দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত এখন ওই মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে এই রায়ের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় রাখতে পারবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ, প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল প্রমাণের মূল্যায়ন, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বিভিন্ন নীতির প্রয়োগ সম্পর্কে ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
