বাজিটা মেসিকে ঘিরেই

বাজিটা মেসিকে ঘিরেই

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে দিন চারেক আগে। তবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপের ‘আসল’ মজাটা শুরু হয়েছে শুক্রবার ভোররাতে, ব্রাজিল- মরোক্কো ম্যাচ দিয়ে। ব্রাজিলপ্রেমীদের উন্মাদনা দেখে অন্তত তাই মনে হয়েছে। আগামীকাল আর্জেন্টিনা আলজেরিয়া ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশটির খেলা নিয়ে এদেশের উন্মাদনার ঢেউ ছেয়ে গেছে দলটির মাঝেও। আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনের সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার রেস দেখা গেছে বহুবার। তবে এসব ছাপিয়ে গেছে মেসির এক পোস্ট। সোশ্যাল মিডিয়ায় ২০০৬ থেকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ছবি শেয়ার করে মেসি জানান দিয়েছেন তিনি আছেন। তার ওপর এখনো বিশ্বাস রাখাই যায়।

কানসাস সিটির ঘাসে পা রাখার আর অল্প সময়ের অপেক্ষা। আলজেরিয়া ম্যাচ দিয়েই ইতিহাসের পাতায় নতুন করে নাম লেখাতে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। নিজের রেকর্ড গড়া ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে ড্রেসিংরুমের বাইরেও মেসিকে নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। মেসির শূন্যতার পূর্ণতা এসেছে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্যদিয়ে। এবার পূর্ণতাকে আরও উচ্চতায় নেয়ার সুযোগ তার সামনে। তবে মিশন শুরুর আগে আর্জেন্টিনা দলের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে চুলচেড়া বিশ্লেষণ করছেন তামাম দুনিয়ার ফুটবল বোদ্ধারা। কাগজে কলমে তিন দেশের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার আর্জেন্টিনা। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়েও তারা সবার ওপরে। তারপরেও তাদের আছে একজন মেসি। বয়স ৩৮ হলেও মেসি এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার।

কোচ লিওনেল স্কালোনির এই দলটির শক্তির প্রধান জায়গা তাদের মানসিকতা ও মিডফিল্ড। তবে রক্ষণভাগ ও অতিরিক্ত মেসিনির্ভরতা কিছুটা চিন্তার কারণ হতে পারে। তবে দলের প্রধান শক্তিমত্তা বিশ্বমানের আক্রমণভাগ। লিওনেল মেসির পাশাপাশি হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাওতারো মার্টিনেজের মতো ফরোয়ার্ডরা রয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে। তাদের হাই-প্রেসিং এবং নিখুঁত পজিশনিং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে চুরমার করতে পারে। এ ছাড়া এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পলের ত্রয়ী মিডফিল্ডকে বিশ্বমানের স্তরে নিয়ে গেছে। তারা যেমন রক্ষণভাগকে বাড়তি সুরক্ষা দেয়, তেমনি নিখুঁত পাসিং ও প্রেসিংয়ের মাধ্যমে আক্রমণভাগের জন্য সুযোগ তৈরি করে। কাতার বিশ্বকাপ এবং টানা দু’টি কোপা আমেরিকা জয়ের পর এই দলটি মানসিকভাবেও যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। চাপের মুখে ভেঙে না পড়ে ম্যাচ বের করে নেয়ার এক অনন্য আত্মবিশ্বাস রয়েছে তাদের মধ্যে। কোচ স্কালোনি কোনো নির্দিষ্ট ফরমেশনে আটকে থাকেন না।

প্রতিপক্ষ বুঝে তিনি ‘লিকুইড ৪-৩-৩’ থেকে শুরু করে ৪-৪-২ ফরমেশনেও দলকে খেলাতে পারেন, যা প্রতিপক্ষের জন্য অনুমান করা কঠিন। পোস্টের নিচে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বড় মঞ্চে এবং বিশেষ করে পেনাল্টি শুটআউটে দলের জন্য সবচেয়ে বড় ত্রাতা ও ভরসার প্রতীক। তবে দলটির দুর্বলতা নেই তা কিন্তু না। আর্জেন্টিনার বর্তমান ব্যাকলাইন বা রক্ষণভাগকে দলটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে লিওনার্দো বালের্দি চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে ছিটকে যাওয়ায় এবং ওতামেন্দির বয়স বেড়ে যাওয়ায় রক্ষণে গতি ও ক্ষিপ্রতার অভাব দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে আছে অতি মাত্রায় মেসিনির্ভরতা। মেসিকে ঘিরে দল খেললেও তার বয়সের কারণে গতিময় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কাউন্টার ডিফেন্ডিংয়ে সমস্যা হতে পারে আর্জেন্টিনার। পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক চাপ। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে ট্রফি ধরে রাখার চাপ সবসময়ই আকাশচুম্বী থাকে। তা ছাড়া কাতার বিশ্বকাপের মতো চমক বা ‘হাঙ্গার’ (ক্ষুধা) ধরে রাখা দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জ উতরাতে হলে মেসিকে দায়িত্ব নিতে হবে সবার আগে। মেসি তা পারবেন। অন্তত তার অভিজ্ঞতা তাই বলে। আর্জেন্টিনার হয়ে এ পর্যন্ত ১৯৯ ম্যাচ খেলেছেন লিওনেল মেসি। যেখানে ১১৭ গোল করার পাশাপাশি ৬০টি অ্যাসিস্ট করেছেন এই প্লে-মেকার। বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ১৩ গোল করেছেন মেসি। আর চার গোল করতে পারলে বিশ্বকাপে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবেন তিনি। বাছাইপর্বে ৩৪ গোল আছে মেসির। এক বিশ্বকাপের জয়ের পাশাপাশি দুইবার কোপা আমেরিকার ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন এই তারকা। এসবের বাইরেও ভূরিভূরি অর্জন রয়েছে মেসির। ছয় থেকে ছাব্বিশ- মাঝখানে কেটে গেছে ২০ বছর। মেসির প্রমাণের আর কিছু বাকি নেই।

ফুটবলকে ভালোবেসে আরও একবার বিশ্বমঞ্চে নামছেন এই ফুটবল জাদুকর। তার শেষ নৃত্য দেখার অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব। সেটা বিশ্বাস করেন তার দীর্ঘদিনের সার্জিও আগুয়েরো। ইএসপিএনের জনপ্রিয় শো ‘লা কাসা দেল কুনেতে’ বসেছিল তারকা ফুটবলারদের হাট। সার্জিও আগুয়েরোর আমন্ত্রণে সেখানে ছিলেন কার্লোস তেভেজ, মার্সেলো গায়ার্দো, এজেকুয়েল লাভেজ্জি, অস্কার রুগেরি এবং কলম্বিয়ান তারকা রাদামেল ফ্যালকাও। মেসির দীর্ঘদিনের রুমমেট ও প্রিয় বন্ধু আগুয়েরো খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই জাদুকরকে। আগুয়েরো বলেন, ‘লিও যত ট্রফিই জিতুক, এমনকি বিশ্বকাপ জেতার পরও অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত সে আরও জিততে চাইবে। কারণ এটাই লিও। সে কখনো রিল্যাক্স করতে জানে না। সে মাঠে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতেই নামবে।’

আগামী ২৪শে জুন ৩৯ বছরে পা দিতে যাওয়া মেসিকে নিয়ে আগুয়েরোর দর্শন, ‘বয়সের কারণে এটাই হয়তো ওর শেষ বিশ্বকাপ। আমি আশা করি ও পরেরটাও খেলুক, তবে ৪২-৪৩ বছর বয়সে খেলাটা কঠিন। যদিও ৪১ বছর বয়সে ক্রিশ্চিয়ানো (রোনালদো) পর্তুগালের হয়ে এই বিশ্বকাপটা খেলছে।’ মাঠে তরুণদের গতি যখন আকাশছোঁয়া, সেখানে দাঁড়িয়ে ৩৮ বছরের মেসি কীভাবে পার্থক্য গড়ে দেন? কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার রাদামেল ফালকাও বলেন, সবকিছুর মূলে রয়েছে মেসির অবিশ্বাস্য ফুটবল বুদ্ধি। আজকের দিনের ফুটবল যে তীব্র গতি আর শক্তিতে খেলা হয়, সেখানেও মেসি পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে শুধু তার বুদ্ধিমত্তা আর অতুলনীয় দক্ষতার জোরে।

মাঠের তরুণরা যখন উড়ছে, তখন মেসির মস্তিষ্কই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।’ পাশে বসা কার্লোস তেভেজ এক লাইনে পুরোটা বুঝিয়ে দিলেন, ‘আসল কথা হলো, মেসি সম্পূর্ণ আলাদা একটা জাত (ভিন গ্রহের)।’ সাবেক সতীর্থ লাভেজ্জিও সুর মেলালেন তেভেজের সঙ্গে, ‘ওকে ইতিহাসের সেরা বলা হয়। ওর সঙ্গে আপনি অন্য কার তুলনা করবেন? কোনো তুলনাই চলে না। ও যতদিন খেলতে চাইবে, পার্থক্য গড়ে দেবে। এখন তো ও একটু নিচে নেমে হোল্ডিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলে বল বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার ও চাইলে যেকোনো দলের বিপক্ষে গোলও করতে পারে। ওর ক্ষুধাটাই অন্য সবার চেয়ে আলাদা।’

মেসির চোট ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে আগুয়েরো কিছুটা চিন্তিত হলেও চান মেসি শুরু থেকেই খেলুক, ‘আশা করি লিও শুরু থেকেই খেলবে। তবে ভয় একটাই, সামান্য অস্বস্তি থাকলেও জোর করে খেলালে পুরো বিশ্বকাপটাই মাটি হতে পারে। এমন নয় যে লিওকে ছাড়া আমরা খেলতে পারি না, কিন্তু ও মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের বক্সে ২০-৩০ মিনিটে এক চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া। আমি জানি, ও যদি নিজে ফিট মনে করে, তবে খেলবেই।’ কানসাসের মাঠে সেই উপভোগের নতুন অধ্যায় দেখতে এখন মুখিয়ে আছে কোটি ফুটবলপ্রেমী।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন