চট্টগ্রামে সম্পত্তি বিক্রি বন্ধ করতে নিজের পিতাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগে দুই বছর পর ছেলে বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই ঘটনায় তার ভায়রা আবদুল জলিলকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেলাল হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বর্ণনা দিয়েছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, নিহত মীর মুজিবুর রহমান (৬০) চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় বাবুর্চি ছিলেন। তিনি চারটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের ঘরে দুই ছেলে বেলাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন, দ্বিতীয় স্ত্রী’র ঘরে এক মেয়ে এবং তৃতীয় স্ত্রী’র ঘরেও এক মেয়ে রয়েছে। জীবনের শেষদিকে তিনি ফটিকছড়ি উপজেলায় দ্বিতীয় স্ত্রী’র নানাবাড়িতে বসবাস করতেন। তদন্তে জানা যায়, দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে মুজিবুর রহমান ধীরে ধীরে নিজের মালিকানাধীন প্রায় ৪০ শতক জমি বিক্রি করেন। পরে বাঁশখালীতে থাকা ভিটেবাড়ির জমিও বিক্রির উদ্যোগ নেন।
এতে ক্ষুব্ধ হন প্রথম স্ত্রী’র ছেলে বেলাল। কারণ জমি বিক্রি হয়ে গেলে পৈতৃক সম্পত্তিতে তাদের অংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে মুজিবুর রহমানের মালিকানায় কেবল সামান্য ভিটেমাটি অবশিষ্ট ছিল। সেটিও বিক্রির চেষ্টা করছেন জানতে পেরে বেলাল জমির দালাল পরিচয়ে পিতার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত হন যে, পিতা শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে চান। এরপরই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জমির দালাল পরিচয়ে পিতার সঙ্গে যোগাযোগের সময় ব্যবহৃত নম্বরে একদিন ভুল করে ফোন করে এক নারীর খোঁজ করেন মুজিবুর রহমান।
বিষয়টি বেলালের মাথায় নতুন পরিকল্পনার জন্ম দেয়। তিনি নিজের এক নারী বন্ধুর কাছে বাবার মোবাইল নম্বর দেন এবং তাকে মুজিবুরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর ওই নারী নিয়মিত ফোনালাপের মাধ্যমে মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দিলে ২০২৪ সালের ৭ই জুন চট্টগ্রাম নগরীতে আসেন মুজিবুর রহমান। তিনি তখন আন্দরকিল্লা এলাকায় দ্বিতীয় স্ত্রী’র মেয়ে সালমা বেগমের বাসায় অবস্থান করছিলেন। পরে ফোনে পরিচয় হওয়া নারীর ডাকে নগরের বাকলিয়া এলাকার একটি বাসায় যান। পিবিআই জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই বাসায় আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন জলিল। সেখানে মুজিবুরকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করানো হয়। কিছু সময়ের মধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
অচেতন অবস্থায় প্রথমে তাকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নগরের সিআরবি এলাকায় নেয়া হয়। পরে সেখানে পৌঁছায় বেলাল। সে লালদীঘির পাড় এলাকা থেকে একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস চালিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। এরপর অচেতন পিতাকে মাইক্রোবাসে তুলে নগরের আউটার রিং রোড এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। আদালতে দেয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, সেখানে বেলাল ও জলিল গলায় গামছা পেঁচিয়ে মুজিবুরকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। পরে মরদেহ সড়কের পাশের জঙ্গলে ফেলে রেখে চলে যায়। পরদিন হালিশহর রিং রোড এলাকার জঙ্গল থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারকালে তার পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি এবং গলায় গামছা ছিল। পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় মরদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
এদিকে পিতার খোঁজ না পেয়ে ২০২৪ সালের ১০ই জুলাই চট্টগ্রাম আদালতে একটি অপহরণ মামলার আবেদন করেন মেয়ে সালমা বেগম। মামলায় বেলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। আদালতের নির্দেশে কোতোয়ালি থানা মামলা রেকর্ড করে তদন্ত শুরু করে। পরে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তভার পায় পিবিআই। দীর্ঘ তদন্তে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে পিবিআই। গত শনিবার নগরের মইজ্জারটেক এলাকা থেকে বেলালকে এবং মিরসরাই উপজেলা থেকে তার ভায়রা জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সম্পত্তি রক্ষার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে পিতাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বেলাল। আদালতে সে ঘটনার বিস্তারিত স্বীকার করেছে।
হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতা করা ওই নারীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পিবিআইয়ের আরেক পরিদর্শক মর্জিনা আক্তার জানান, বেলালের দেয়া তথ্য, উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন এবং নিহতের মেয়ের দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, হালিশহর রিং রোড এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি মীর মুজিবুর রহমানের।
