ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে সাংবাদিকের আবেদন: গণমাধ্যম প্রশ্নের মুখে

ফন্ট সাইজ:

সমপ্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনারের বাংলাদেশে আগমনের সময় এক সাংবাদিকের বক্তব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু “ব্যাপক আলোচনা হয়েছে কিনা” সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো-এ ধরনের বক্তব্য ও তার প্রতিক্রিয়া কি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক শিষ্টাচার, জাতীয় মর্যাদা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের আত্মপ্রতিচ্ছবির ওপর কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে কিনা!

ভারতীয় হাইকমিশনারকে সাংবাদিক বলেন-
“আমরা ছোট রাষ্ট্র, আপনারা বড় শক্তি, আপনারা আমাদের লালন-পালন করবেন।”
প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ মন্তব্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গণমাধ্যম নৈতিকতা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন থেকে দেখলে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা। কারণ এখানে শুধু একজন ব্যক্তির মতামত প্রকাশ পায়নি; বরং এমন এক মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে, যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকসুলভ মর্যাদাবোধ, সার্বভৌম আত্মপরিচয় এবং নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণ করার জাতীয় অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ কি সত্যিই ছোট রাষ্ট্র?
জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্র। প্রায় ১৮ কোটিরও বেশি মানুষের এই দেশ বিশ্বের শীর্ষ জনবহুল রাষ্ট্রগুলোর একটি। পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্রের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
তাহলে প্রশ্ন আসে-বাংলাদেশের চেয়ে অনেক ছোট জনসংখ্যার রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের এভাবে উপস্থাপন করে? সিঙ্গাপুর, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড কিংবা ইসরাইল-এসব দেশের জনসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা নিজেদের পরিচয় দেয় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, সমমর্যাদার ভিত্তিতে। তারা সহযোগিতা চায়, কিন্তু অভিভাবকত্ব চায় না; অংশীদারিত্ব চায়, কিন্তু লালন-পালনের আবেদন করে না। কারণ মর্যাদার উৎস জনসংখ্যা নয়, আত্মবিশ্বাস। রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিকদের মানসিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদাবোধের মধ্যেও নিহিত থাকে।

সহযোগিতা বনাম অভিভাবকত্ব: ‘আমরা ছোট রাষ্ট্র’-এই বক্তব্য তাই বাস্তবতার চেয়ে মানসিকতার প্রকাশ বেশি। এটি ভূগোলের ভাষা নয়; এটি আত্মবিশ্বাসহীনতার ভাষা। যে জাতি নিজের শক্তিকে ভুলে যায়, সে অন্যের করুণাকে শক্তি বলে মনে করতে শুরু করে।

আরও উদ্বেগজনক হলো ‘লালন-পালন’ শব্দটির ব্যবহার। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হয় সহযোগিতা, সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। সেখানে ‘লালন-পালন’ শব্দটি অভিভাবক ও নির্ভরশীলের সম্পর্ক নির্দেশ করে। একজন স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবাদিক যখন বিদেশি কূটনীতিকের সামনে এই ভাষা ব্যবহার করেন, তখন তিনি অজান্তেই বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদার নয়, বরং অভিভাবক-নির্ভর সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন।
গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভূমিকা: এখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা প্রিন্ট মিডিয়া কীভাবে এমন একজন প্রতিনিধিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অনুষ্ঠান কাভার করার জন্য পাঠায়, যিনি সংবাদ সংগ্রহের পরিবর্তে ব্যক্তিগত নির্ভরতার ভাষায় কথা বলেন?

অবশ্যই এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক বা তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কিনা, কিংবা প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বক্তব্যকে সমর্থন করে কিনা-তা জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি অভিযুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন তোলার সুযোগ অবশ্যই আছে। কারণ গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে তার প্রতিনিধির পেশাগত আচরণের ওপর।

পেশাদারিত্বের স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতা: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে কি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধির সামনে নিজের রাষ্ট্রের মর্যাদা খাটো করা? অবশ্যই নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে সত্য বলার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনার স্বাধীনতা। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই আত্মঅবমাননার বিকল্প নয়। সাংবাদিকতার কাজ তথ্য সংগ্রহ করা, বিশ্লেষণ করা এবং জনগণের পক্ষে প্রশ্ন তোলা; কোনো বিদেশি শক্তির কাছে নিজের রাষ্ট্রের দুর্বলতার আবেদন পেশ করা নয়।

আরও স্পষ্টভাবে বলা যায়, এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নয়; বরং সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও প্রস্তুতির প্রশ্ন। কারণ একজন সাংবাদিক যখন নিজের অবস্থান ভুলে যান, তখন তিনি শুধু নিজের মর্যাদাই ক্ষুণ্ন করেন না; তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেন, তার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেন।

তবে এই সমালোচনার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে হেয় করা নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। যারা এই ধরনের সাংবাদিকতা করেন, তাদের জন্যও এটি আত্মসমালোচনার সুযোগ। সাংবাদিক যদি নিজেকে একজন স্বাধীন নাগরিকের পরিবর্তে কারও করুণার প্রত্যাশী হিসেবে কল্পনা করেন, তাহলে তিনি ক্ষমতার কাছে কঠিন প্রশ্ন করার নৈতিক শক্তিও হারিয়ে ফেলেন। সাংবাদিকতার প্রথম শর্তই হলো স্বাধীন মানসিকতা; পরনির্ভর মানসিকতা নয়। বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে আত্মমর্যাদার সংগ্রামের মধ্যদিয়ে। এই রাষ্ট্র কারও দান নয়, কারও করুণা নয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ভিত্তি হলো মর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সমতার অধিকার।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়: এই ঘটনার পর গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন:
১. সাংবাদিকদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক ভাষা এবং রাষ্ট্রচেতনা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার।
২. সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের প্রতিনিধিদের পেশাগত আচরণবিধি আরও স্পষ্ট করতে হবে, যাতে সংবাদ সংগ্রহ এবং ব্যক্তিগত মত প্রকাশের সীমারেখা পরিষ্কার থাকে।
৩. সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এ ধরনের বিতর্কিত ঘটনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বিষয় না বানিয়ে পেশাগত মানোন্নয়নের আলোচনায় রূপান্তর করতে হবে।
৪. গণমাধ্যমে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আত্মসম্মান, সমমর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সচেতনতা পেশাগত দক্ষতারই অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সবশেষে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে মনে রাখতে হবে-স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং জাতীয় আত্মমর্যাদা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক। একটি সত্যিকারের স্বাধীন গণমাধ্যম কখনো ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে না, আবার কোনো বিদেশি শক্তির কাছেও আত্মসমর্পণের ভাষায় কথা বলে না।

সুতরাং, ভারতীয় হাইকমিশনারের কাছে ওই সাংবাদিকের আবেদনকে একটি বিচ্ছিন্ন মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের গণমাধ্যমের পেশাগত মান, রাষ্ট্রচেতনা, জাতীয় আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উত্থাপন করেছে। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি সহযোগিতা চায়, বন্ধুত্ব চায়, অংশীদারিত্ব চায়; কিন্তু কখনো অভিভাবকত্ব চায় না। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিকের ভাষা করুণা প্রার্থনার ভাষা নয়-তার ভাষা সমমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং মর্যাদাপূর্ণ অংশীদারিত্বের ভাষা। বাংলাদেশের গণমাধ্যমেরও সেই ভাষাই ধারণ করা উচিত।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

[email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন