একটি অখ্যাত দল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে চলছে জোর আলোচনা। দলটির নাম ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত এই নামে যে কোনো রাজনৈতিক দল আছে, তা কারোরই জানা ছিল না। মুহূর্তে দলটি জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উঠে এসেছে। দলটির নাম প্রথম শোনা গেল তখনই, যখন তৃণমূল কংগ্রেসের বিদ্রোহী সাংসদেরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করে জানালেন যে, তাদের ব্লক এনসিপিআই-এ মিশে যাচ্ছে।
সমাজকর্মী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কর্মী সুজিত দে এনসিপিআই-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় এর নিবন্ধিত অফিস। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অব ইন্ডিয়া নামের একটি দল ২০২৩ সালে আরইউপিপি (রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি) তালিকাভুক্ত হয়। কমিশন অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলটি ২০২৩ সালে ত্রিপুরায় বিধানসভা ভোটে দু’টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছে।
তবে বিদ্রোহী তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদদের যোগদানের পর সোমবার এনসিপিআই-এর তরফে একটি গ্রাফিক পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে যে, লোকসভার সাংসদ সংখ্যার বিচারে তারাই পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম দল। ওই গ্রাফিকে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যে বিজেপি’র ১২ জন লোকসভার সাংসদ রয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদসংখ্যা ৮। কংগ্রেসের এক। আর লোকসভায় এনসিপিআই-এর সাংসদসংখ্যা ২০। এই গ্রাফিকের সঙ্গে লেখা হয়েছে, লোকসভায় ২০টি আসন নিয়ে এনসিপিআই এখন সংসদীয় শক্তির বিচারে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম শক্তি।
তবে ঘোষণা যাই হোক না কেন তৃণমূল কংগ্রেস দলের বিদ্রোহী সাংসদদের ভাগ্য এখন দোলাচলে। তাদের ভাগ্য প্রাথমিকভাবে এখন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার হাতে। তৃণমূল নেতৃত্ব এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী উভয়ের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক আবেদনপত্র পাওয়ার পর, স্পিকারকে এখন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ২০ জন সাংসদের এনসিপিআই-তে অভ্যন্তরীণ অন্তর্ভুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়া হবে কিনা, এবং সরকারি বেঞ্চের অংশ হিসেবে তাদের জন্য পৃথক আসনের ব্যবস্থা করা হবে কিনা।
বিষয়টির সাংবিধানিক গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট নজিরের কারণে স্পিকারের কার্যালয় থেকে দেয়া কোনো সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি আদালতে একটি দীর্ঘ ও তীব্র আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে, যা দশম তফসিল পরিষ্কারভাবে সমাধান করে না। অনুচ্ছেদ ৪ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের একীভূত হওয়ার জন্য কি কোনো প্রকৃত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন আছে, নাকি শুধুমাত্র দুই-তৃতীয়াংশ আইনসভার জোটই যথেষ্ট?
অনুচ্ছেদ ৪-এর ভাষায় ‘মূল রাজনৈতিক দল’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃহত্তর সংগঠনটি শুধু আইনসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নয়। অনুচ্ছেদ ৪ এই দুটির মধ্যে একটি কাঠামোগত পার্থক্য তৈরি করে। একটি রাজনৈতিক দল প্রার্থী দেয় এবং হুইপ জারি করে; একটি আইনসভার দল হলো সেই প্রার্থীরা, যারা নির্বাচিত হওয়ার পর একত্রিত হন। এদের বিনিময়যোগ্য হিসেবে গণ্য করার অর্থ হবে, তারা সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি করে কার্যকরভাবে সেই দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবেন, যে দল তাদের সমর্থন জুগিয়েছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে, দশম তফসিল উভয়ের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনেছে এবং আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক দলের পরিচয় বা সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারে না। যদি আইনপ্রণেতারা কেবল সংখ্যার জোরে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হুইপ নিয়োগ করতে বা দলের পরিচয় দাবি করতে না পারেন, তাহলে একই যুক্তিতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তারা একতরফাভাবে কোনো একীভূতকরণও কার্যকর করতে পারেন না। তা সত্ত্বেও, আইনি অবস্থানটি এখনো চূড়ান্ত নয়।
