আরইবিতে মানহীন মালামাল সরবরাহ, শর্তভঙ্গের এন্তার অভিযোগ

আরইবিতে মানহীন মালামাল সরবরাহ, শর্তভঙ্গের এন্তার অভিযোগ

ফন্ট সাইজ:

আরইবিতে দরপত্রের মাধ্যমে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সংস্থাটিতে দরপত্র গ্রহণ বা বাতিল নিয়েও রহস্যজনকভাবে চলছে তোড়জোড়। এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সংস্থাটির ভেতরের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের ভূমিকা নিয়েও। আরইবি’র একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নে ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের কারণে বিলম্ব সৃষ্টি হলেও বিগত সরকারের সময় থেকে প্রতিষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। দরপত্র ভঙ্গ এবং বিলম্বে সরবরাহের অভিযোগ ওঠে বিদেশি ওই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
সূত্র মতে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) একের পর এক দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ, বিলম্বিত সরবরাহ ও মানহীন মালামাল সরবরাহের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও চীনা প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিক ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ লিমিটেড রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আরইবি’র একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নে ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের কারণে বিলম্ব সৃষ্টি হলেও বিগত সরকারের সময় থেকে প্রতিষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে ব্যবসা করে যাচ্ছে। সর্বশেষ একটি পরিদর্শনে বাতিল হওয়া ‘ড্রপ আউট ফিউজ কাটআউট’ রহস্যজনকভাবে আবারো আরইবিতে গ্রহণের তোড়জোড় চলছে যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটির ভেতরের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের ভূমিকা নিয়ে। আরইবি’র দরপত্র প্যাকেজ নং পিবিএসএফ/২৪-২৫/জি-৫৫ অনুযায়ী গত ২৫শে জানুয়ারির মধ্যে ৩০ হাজার ড্রপ আউট কাটআউট ও ৩০ হাজার ব্যারেল সরবরাহ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিক সরবরাহ করেছে মাত্র ১৬ হাজার কাটআউট ও ২১ হাজার ব্যারেল। এখানেই শেষ নয়। নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ব্যারেলের দৈর্ঘ্য ৩০০ মিলিমিটার হওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহকৃত ব্যারেলে পাওয়া গেছে ৩০২ মিলিমিটার। এ কারণে পরিদর্শন টিম এসব মালামাল বাতিল ঘোষণা করে। তবে অভিযোগ উঠেছে, বাতিল হওয়া ব্যারেল লট পুনরায় গ্রহণের জন্য আরইবি’র একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ব্যারেল গ্রহণ করা হলে মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হবে। কারণ এই ব্যারেলে প্রয়োজনে অন্য কোম্পানির যন্ত্রাংশ সংযুক্ত করা সম্ভব হবে না। এতে সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মারাত্মক বিড়ম্বনার মুখে পড়বেন। এসব ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিককে ছাড় দেয়ার চেষ্টা চলছে। আরইবি সূত্র জানিয়েছে, ‘উপরের চাপের কারণে’ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না। আরইবি’র এক কর্মকর্তা বলেন, সব অনিয়ম নথিভুক্ত আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের জায়গায় গিয়ে হাত বাঁধা পড়ে যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সংগ্রহ পরিদপ্তরের পরিচালক আরমান আহসান মানবজমিনকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত আকারে আমাদের কাছে আসলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিবো। মূল প্রতিষ্ঠানকে ধরতে সুবিধা হবে। এজন্য আমরা প্রস্তুত আছি বলেও তিনি জানিয়েছেন।
ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। আগের সব ঘটনায় দায় চাপানো হয়েছে লোকাল পার্টনারদের ওপর। নির্ধারিত সময়ে মালামাল সরবরাহ না করায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমএম করপোরেশনকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। অথচ লিড কোম্পানি হিসেবে ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিক কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একইভাবে, ভিন্ন তিনটি প্যাকেজে বিলম্বিত সরবরাহের জন্য ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের আরেক পার্টনার মাহবুব ট্রেডারকে বিপুল অংকের জরিমানা করা হয়। অথচ এখানেও মূল কোম্পানি থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
জানা গেছে, ২০২৩ সালে মাহবুব ট্রেডার (লোকাল পার্টনার) লাইটিং এরেস্টারের একটি দরপত্রে অংশ নেয় (বিআরইবি/ডিপি/পিবিএসএফ-জি-১৩৩)। নির্ধারিত সময়ে এয়ার ব্রেক সুইচ ও বাইপাস অ্যান্ড ডিসকানেক্ট সুইচ সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের চার কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। মাহবুব ট্রেডার আরইবি পরিচালক (সংগ্রহ পরিদপ্তর) বরাবরে লিখিতভাবে জানায়, নির্ধারিত সময়ে এলসি খোলা হলেও ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের কারণে মালামাল সরবরাহ বিলম্বিত হয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিকের প্রতিনিধি স্যামুয়েল ওয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের তথ্যও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, ওরিয়েন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে টাইপ টেস্ট রিপোর্ট ও ড্রয়িংয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মালামাল সরবরাহের চেষ্টা করেছে, যা স্পষ্ট প্রতারণার শামিল। পরবর্তীতে আরইবি নতুন করে অনুমোদন দিলে অতিরিক্ত মূল্য ও ২৪৫ দিনের বিলম্ব হয়।
মাহবুব ট্রেডারের দাবি, ওরিয়েন্ট ইলেকট্রিক বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বাংলাদেশি সরবরাহকারীর মাধ্যমে দরপত্রে অংশ নেয়। কারও ক্ষেত্রে সীমিত মালামাল দিলেও অন্যদের হয়রানি ও হেনস্তা করেছে। একই অভিযোগ রয়েছে বাঁধন ইঞ্জিনিয়ারিং রপোরেশনেরও। যৌথভাবে ২০০ এয়ার ব্রেক সুইচ সরবরাহের কাজ পেলেও নির্ধারিত সময় (মার্চ ২০২৫) পেরিয়ে মে মাসের শেষদিকে সরবরাহ দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, লিড কোম্পানিকে দায়মুক্ত রেখে শুধু লোকাল পার্টনারদের শাস্তি দেয়া আরইবি’র ভেতরের গভীর দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন