দেশের ক্রিকেটে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে নতুন আশার আলো দেখছেন সংগঠকরা। গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, যার উত্তাপ এখনো শেষ হয়নি। অনিয়ম ও সরকারি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলে বেশ কয়েকটি ক্লাব নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটের সব আসর থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে ঢাকার শীর্ষ ক্লাবগুলো। এতে দেশের ক্রিকেট কাঠামো বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন লীগ আয়োজন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সমপ্রতি দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের পর ক্রীড়াঙ্গন পেয়েছে নতুন অভিভাবক। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক। সোমবার ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বিদ্রোহী ক্লাবগুলোর। ক্লাব সংগঠকদের নেতা রফিকুল ইসলাম বাবু দৈনিক মানবজমিনকে বলেন, ‘আমরা মামলাটা প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে এসেছি। খুব দ্রুতই সেটি সক্রিয় হবে। আর যেহেতু এখন আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক মন্ত্রী আছেন। আমরা তার সঙ্গে বসেই আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেবো। তার সঙ্গে রোববার (আজ) আলোচনায় বসার কথা। তার সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবো আমরা।’ বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক একজন সাবেক তারকা খেলোয়াড়। দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই তিনি খেলাধুলায় শৃঙ্খলা ফেরানোর ইঙ্গিত দেন। তার বক্তব্যে ক্লাবগুলোর মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ঢাকার ৪৫টি ক্লাব দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে অবস্থান করছে। তারা বর্তমান বোর্ডের অধীনে কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে না। এতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ লীগ বন্ধ রয়েছে। বহু ক্রিকেটারের রুটি-রুজি এখন হুমকির সম্মুখীন। সংগঠকরা মনে করেন, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তারা চাইছেন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন করা হোক। পূর্ববর্তী বোর্ডের আধিপত্যের অবসান ঘটাতে তারা বদ্ধপরিকর। মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে তারা সব দাবি তুলে ধরবেন। ক্লাব সংগঠকদের আরেক প্রতিনিধি ও মোহামেডান ক্লাবের পরিচালক মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি আমি এখনো জানি না। তবে শুনেছি আলোচনা হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই আমরা তার সঙ্গে বসব। তিনি যা বলবেন সেই অনুসারেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ তিনিই এখন আমাদের অভিভাবক। আর আমাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো আইনি প্রক্রিয়াতে এগিয়ে যাওয়া, সেটি নিয়েই কাজ করছি।’ সংগঠকদের প্রধান অভিযোগ বোর্ডের বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে। গত বছরের ওই নির্বাচনটি সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল বলে দাবি তাদের। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের গঠনতন্ত্রও সেখানে মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি অবৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান বোর্ড ক্ষমতায় বসেছে বলে মনে করেন তারা। সংগঠকরা আশা করছেন খুব শিগগিরই এই বোর্ডকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে। এই বিষয়ে আইনি লড়াইও চলমান রয়েছে। আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার ব্যাপারে তারা অত্যন্ত আশাবাদী। বর্তমান বোর্ড পর্ষদ ভেঙে দিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠনের দাবিও তুলছেন অনেকে। তারা মনে করেন, ক্রিকেটের স্বার্থেই এই পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে দেশের ক্রিকেটের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্লাব ক্রিকেটের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বিসিবি’র অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ফেরাতে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের অপেক্ষায় আছেন মাঠপর্যায়ের সংগঠকরা। তারা চান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ক্রিকেট বোর্ড, যেখানে ক্লাবের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
বিসিবি’র বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা নিরসনে শক্ত অবস্থান নিচ্ছেন সংগঠকরা। শীর্ষ এক ক্লাব সংগঠক আরও জানান, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায় থেকে যেসব কাউন্সিলর এসেছেন তাদের বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই বিষয়ে আদালতে একটি রিট আবেদন জমা দেওয়া আছে। আদালত যদি এই কাউন্সিলরদের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করেন, তাহলে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হবে। সেক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অন্তত দশজন পরিচালকের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ঢাকার ক্লাবগুলোর ভোটগ্রহণ পদ্ধতি নিয়েও তিনি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের দিন সরাসরি উপস্থিত থাকার পরও অনেককে আগের দিন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে দেখা গেছে। এটি নির্বাচনী বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করেন এই বর্ষীয়ান সংগঠক। তাঁর দাবি, প্রকৃত ক্লাব প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের ভোটার করা হয়েছে। অনেক ঐতিহ্যবাহী ক্লাবের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এর ফলে যোগ্য সংগঠকরা বোর্ড থেকে ছিটকে পড়েছেন। তারা এখন হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ। সংকট কাটাতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠকরা মনে করেন, বিসিবির বর্তমান অবস্থা আইসিসির নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারি হস্তক্ষেপের অজুহাত দেখিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ নেই বলে তাদের বিশ্বাস। কারণ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইনি বাধ্যবাধকতা। ক্লাবগুলোর বয়কটের কারণে গত কয়েক মাসে প্রিমিয়ার লীগসহ অন্যান্য আসর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এতে ক্লাবগুলোর আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে ব্যাপক। অনেক ক্লাব তাদের বিদেশি খেলোয়াড়দের চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। স্থানীয় ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই পরিস্থিতিতে ঘরোয়া ক্রিকেট কবে মাঠে গড়াবে তা এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। তবে নতুন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরই সবকিছু পরিষ্কার হবে। ক্লাবগুলোর দৃঢ় অবস্থান এবং আইনি লড়াই দেশের ক্রিকেটে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিচ্ছে। দ্রুতই জট খুলবে এবং ক্রিকেটে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা সবার। ক্রিকেটপ্রেমীরাও চান মাঠের খেলা দ্রুত ফিরুক এবং বিতর্কের অবসান হোক।
