দেশে প্রথম পরিবেশ বিষয়ক শিল্প প্রদর্শনী এসডো’র

শিল্প ও পরিবেশ আন্দোলনের মেলবন্ধন

দেশে প্রথম পরিবেশ বিষয়ক শিল্প প্রদর্শনী এসডো’র

ফন্ট সাইজ:

দেশে তিন দিনব্যাপী প্রথম পরিবেশ বিষয়ক শিল্প প্রদর্শনী “আমাদের পরিবেশ: দূষণে ম্লান সৌন্দর্য” শুরু হয়েছে। রোববার থেকে রাজধানীর ধানমণ্ডিস্থ খ্যাতনামা গ্যালারি চিত্রকে শিল্পকলা,পরিবেশ আন্দোলন এবং জনসচেতনতাকে এক সুতোয় গেঁথে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন-এসডো’র উদ্যোগে আয়োজিত প্রদর্শনীটি সফলভাবে উদ্বোধন করা হয়। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগটি সৃজনশীলতার মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরার জন্য এটি একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

চারুকলা প্রদর্শনীকে সাফল্যমণ্ডিত করতে দেশের ৪০ জন বিশিষ্ট ও সম্ভাবনাময় শিল্পী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ৪৫ এর বেশি শিল্পকর্ম প্রদান করেছেন। প্রদর্শনীটি আগামী ১৬ই জুন পর্যন্ত চলবে।

শিল্পকর্মের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা ও আন্দোলনের এই উৎসবে দেশের খ্যাতিমান ও উদীয়মান শিল্পীদের অসাধারণ সব শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। এসব শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান বর্জ্য সংকট, বায়ু দূষণ, রাসায়নিক দূষণ, জীববৈচিত্র্য হ্রাস এবং পরিবেশগত অবিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

শিল্পকর্মের মাধ্যমে গ্যালারিটি রূপ নিয়েছিল পরিবেশ বাস্তবতার এক শক্তিশালী দৃশ্যকাহিনীতে। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক বা নীতিগত আলোচনার বাইরে গিয়ে দর্শনার্থীরা পরিবেশের সংকটগুলোকে সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ পান।
প্রদর্শনীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ইন্টারেক্টিভ “নিজের ব্যাগ নিজে আনুন” ডিআইওয়াই কর্নার। সেখানে দর্শনার্থীরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগে আঁকিবুঁকি করেছেন। একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) পলিথিন ব্যাগ বর্জন করে পরিবেশবান্ধব বিকল্প বেছে নিতে এই উদ্যোগটি সবাইকে উৎসাহিত করে। এর মূল বার্তা ছিল, পরিবেশ রক্ষা শুরু হয় আমাদের দৈনন্দিন পছন্দ এবং আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই।
আরও একটি শক্তিশালী সংযোজন ছিল প্রশংসিত তথ্যচিত্র ÒPlastic DetoxÓ প্রদর্শন। দর্শনার্থীরা এখানে বিশ্বব্যাপী পরিচালিত আন্দোলন ‘ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক’ দ্বারা নির্মিত প্রশংসিত ডকুমেন্টারি “প্লাস্টিক ডিটক্স” দেখার সুযোগ পান। প্রামাণ্যচিত্রটিতে প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চক্র এবং এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

পাশাপাশি, প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার থেকে শুরু করে পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব, অর্থাৎ প্লাস্টিকের সম্পূর্ণ জীবনচক্র একটি উদ্ভাবনী “বায়োস্কোপ ইনস্টলেশন” এর মাধ্যমে প্রদর্শন করা হয়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই সাংস্কৃতিক মাধ্যমটিকে নতুনভাবে ব্যবহারের ফলে দর্শনার্থীরা খুব সহজেই সমাজে প্লাস্টিকের অদৃশ্য যাত্রা ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বুঝতে পারেন।

প্রদর্শনীতে সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশবিদ, জ্যেষ্ঠ শিল্পী, শিক্ষাবিদ, যুবনেতা, গণমাধ্যমকর্মী, উন্নয়নকর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, পরিবেশ রক্ষার জন্য কেবল নীতিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়, বরং একটি বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রয়োজন যা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক বলেন, পরিবেশের ক্ষতি কেবল কোনো প্রযুক্তিগত বা আইনি বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনের গল্প, যা আমাদের স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং আগামী প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলে। উপাত্ত বা রিপোর্ট যা পারে না, শিল্পকলা খুব সহজেই সেই বাস্তবতাকে মানুষের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পারে। এই প্রদর্শনী প্রমাণ করে যে, সৃজনশীল প্রকাশ কীভাবে পরিবেশ সচেতনতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ মন্তব্য করে বলেন, বাংলাদেশ নানা ধরনের পরিবেশ ও জলবায়ুগত ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আইনের সংস্কার ও প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি জনগণের সম্পৃক্ততাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের প্রদর্শনী নাগরিক সমাজকে চিন্তা করতে, আলোচনা করতে এবং সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করে পরিবেশ বিজ্ঞানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমিয়ে আনে।
এসডো’র মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, পরিবেশের সংকটগুলো সাধারণত বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন, নীতি নির্ধারণী দলিল বা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আলোচনা করা হয়। এগুলো জরুরি হলেও সবসময় মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে না। এই প্রদর্শনীটি সেই শূন্যতা পূরণের জন্যই আয়োজন করা হয়েছে, যাতে শিল্প, সংস্কৃতি ও গল্পের মাধ্যমে পরিবেশের বাস্তবতাকে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেয়া যায়। আমরা বিশ্বাস করি, টেকসই পরিবেশগত পরিবর্তনের জন্য সচেতন নাগরিকের পাশাপাশি অনুপ্রাণিত নাগরিকেরও প্রয়োজন।
এসডো’র নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, এই প্রদর্শনীটি বাংলাদেশে পরিবেশ আন্দোলনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শিল্পকলার মাঝে আলোচনার সূত্রপাত করার, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়ার এবং মানুষকে কাজে উদ্বুদ্ধ করার এক অনন্য ক্ষমতা রয়েছে, যা পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই উন্নয়নের পথকে আরও বেগবান করবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি-এর কমিউনিকেশনস প্রধান মো. রোজার ইবনে আজাদ বলেন, টেকসই উন্নয়ন কেবল কোনো নির্দিষ্ট খাতের অগ্রাধিকার নয়, এটি আমাদের সবার সামাজিক দায়িত্ব। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করে এমন একটি অর্থপূর্ণ প্ল্যাটফর্মের অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত।

সাবেক সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, আমাদের পরিবেশ রক্ষায় কেবল নীতি ও নিয়মের চেয়েও বেশি প্রয়োজন জনসচেতনতার আমূল পরিবর্তন। এই ধরণের সৃজনশীল উদ্যোগকে সমর্থন করার মাধ্যমে আমরা আমলাতান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারি এবং ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এই গ্রহকে সুরক্ষিত রাখতে একটি যৌথ ও আবেগঘন অঙ্গীকার তৈরি করতে পারি।

গ্যালারি চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, শিল্প এবং পরিবেশ আন্দোলনের এই মেলবন্ধন মানুষকে মানসিকভাবে এমন কিছু বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করে, যা সাধারণত দূরবর্তী বা অমূর্ত বলে মনে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ড. মো. আজহারুল ইসলাম শেখ সামাজিক পরিবর্তনে শিল্পীদের ভূমিকার ওপর জোর দেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন