স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পর ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন ইলন মাস্ক। বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় দুই ট্রিলিয়ন বা দুই লাখ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। তবে বিপুল এই সম্পদের মালিক হয়েও তার ব্যক্তিগত জীবনযাপন বিস্ময়করভাবে সাধারণ। বৃহস্পতিবার প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির (আইপিও) মাধ্যমে স্পেসএক্স ৭৫০০ কোটি ডলার সংগ্রহ করে। প্রতিষ্ঠানটি ১৩৫ ডলার দরে ৫৫ কোটি ৫০ লাখের বেশি শেয়ার বিক্রি করে।
ফলে রকেট ও স্যাটেলাইট নির্মাতা কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ১ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন বা এক লাখ ৭৭ হাজার কোটি ডলার। শুক্রবার স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে শেয়ারপ্রতি ১৬২ ডলারে পৌঁছায়। স্পেসএক্সে মাস্কের মালিকানা এবং টেসলার শেয়ারের মূল্য হিসাব করলে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। কিন্তু কল্পনাতীত এই সম্পদের মালিক হয়েও মাস্কের প্রতিদিনের বাসস্থান টেক্সাসের একটি ছোট প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড ঘর। ফর্চুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ২০২০ সালে টেক্সাসে চলে যাওয়ার পর এবং নিজের বিভিন্ন কোম্পানির কার্যক্রম সেখানে স্থানান্তর করার পর মাস্ক ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা তার অধিকাংশ বিলাসবহুল সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। তিনি অবশ্য অস্টিনের কাছে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার মূল্যের কয়েকটি সম্পত্তি কিনেছিলেন।
তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার প্রধান বাসস্থান হলো টেক্সাসের বোকা চিকার স্পেসএক্সের স্টারবেজ স্থাপনার কাছে অবস্থিত অনেক ছোট একটি বাড়ি। ২০২১ সালে মাস্ক প্রকাশ করেন যে, তিনি প্রায় ৫০ হাজার ডলার মূল্যের একটি বাড়িতে থাকেন, যা তিনি স্পেসএক্সের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছিলেন, আমার প্রধান বাসা বলতে বোকা চিকা/স্টারবেজে অবস্থিত প্রায় ৫০ হাজার ডলারের একটি বাড়ি, যা আমি স্পেসএক্সের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি। তবে এটি দারুণ।
বক্সঅ্যাবল নামের একটি আবাসন স্টার্টআপ এই ছোট ঘরটি নির্মাণ করেছে। এর আয়তন মাত্র ২০ ফুট বাই ২০ ফুট, অর্থাৎ প্রায় ৪০০ বর্গফুট। টেক্সাসভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রনের তথ্য অনুযায়ী, বাড়িটিতে একটি বসার জায়গা, শোবার স্থান, রান্নাঘর এবং বাথটাব-শাওয়ারসহ একটি বাথরুম রয়েছে। মাস্কের এই ছোট বাসস্থান তার দীর্ঘদিনের অভ্যাসেরই প্রতিফলন। তিনি সবসময় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করেন। ২০২৩ সালে তার জীবনীকার ওয়াল্টার আইজ্যাকসন বাড়িটির ভেতরের একটি ছবি প্রকাশ করেন এবং এটিকে খুবই সাধারণ দুই শোবার ঘরের বাড়ি হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষায়, মাস্ক সেখানে কাঠের একটি টেবিলে বসে ফোনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করতেন।
চলতি বছরের শুরুতে মাস্কের মা মায়ে মাস্কও সেখানে গিয়ে থাকার অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি এক্সে লিখেছিলেন, ফ্রিজে কোনো খাবার নেই। আমি যে গ্যারেজে ঘুমিয়েছি, সেটি ডান পাশে। শাওয়ারে মাত্র একটি তোয়ালে ছিল, তাই সেটি ইলনের জন্য রেখে দিয়েছিলাম। এতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। ছোটবেলায় আমি কালাহারি মরুভূমিতে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত গোসল ছাড়া কাটিয়েছি। বহুবার। সেখানে পানি ছিল না। আমার মনে হয়, আমার বাবা-মা আমাকে এই বিলাসিতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।
কঠোর কর্মসূচির জন্য পরিচিত মাস্ক প্রায়ই আরামের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। টেসলার মডেল থ্রি উৎপাদন সংকটের সময় তিনি নাকি ক্যালিফোর্নিয়ায় কোম্পানির কারখানাতেই রাত কাটাতেন। মাস্কের এই জীবনযাপন নিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে মতভেদ দেখা গেছে।
একজন এক্স ব্যবহারকারী লিখেছেন, যারা ভাবছেন, তাদের জন্য বলি- ইলন মাস্ক ট্রিলিয়নিয়ার হয়েও এখনো সাধারণ একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। যদি তার এত টাকা থাকার কারণে আপনার রাগ হয়, তাহলে হয়তো আপনি শুধু ঈর্ষান্বিত, অথবা সমাজতান্ত্রিক-কমিউনিস্ট। আরেকজন লিখেছেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই ট্রিলিয়নিয়াররা এমনই হোক। তিনি নিজের সম্পদ প্রদর্শন করছেন না। তার নগদ অর্থ এক বিলিয়ন ডলারও নয়, আর তার মোট সম্পদের ৯৯ শতাংশেরও বেশি কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত। তবে সবাই এ বিষয়ে একমত নন। রেডিটের এক ব্যবহারকারী দাবি করেন, এসব কৌশল মূলত মাস্ককে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
তিনি লিখেছেন, যারা এসব বিশ্বাস করে তারা বোকা। তিনি এমন দাবি করেন যা প্রযুক্তিগতভাবে সত্য হতে পারে। কিন্তু নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানির মাধ্যমে সম্পত্তি কেনার মতো নানা কৌশল ব্যবহার করে বিপুল সম্পদ জমা রাখেন। অথচ তার অনুসারীরা তাকে সাধারণ মানুষের একজন বলে মনে করে।
