বৃহস্পতিবার রাতে মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের থিম সং ‘দাই দাই’ দিয়ে ফুটবলের এগিয়ে যাওয়ার গল্প শুনিয়েছেন পপ স্টার শাকিরা। শনিবার রাতে কানাডার টরোন্টোর আরেকটি উদ্বোধনে বাংলাদেশকে টেনে আনলেন ডিজে সঞ্জয় দেব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি শুধু একটি গান পরিবেশন করেননি, বরং নিজের শিকড়, পরিচয় এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার এক শক্তিশালী বার্তাও তুলে ধরেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি এমনভাবে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। শুক্রবার কানাডায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলিউড তারকা নোরা ফাতেহি এবং ফরাসি পপশিল্পী ভেজিড্রিমের সঙ্গে জনপ্রিয় গান ‘সির সির’ পরিবেশন করেন সঞ্জয়। তবে তার পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে তার পোশাক এবং তার মাধ্যমে দেয়া বার্তা।
বিশেষভাবে তৈরি করা মেরুন রঙের স্যুটে তিনি তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতীক। স্যুটে ফুটে উঠেছিল জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফুল শাপলা এবং বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার নকশা। বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রীড়া আসরের উদ্বোধনী মঞ্চে এমন উপস্থাপনা অনেকের কাছেই ছিল আবেগঘন একটি মুহূর্ত। পারফরম্যান্স চলাকালে বারবার নিজের পোশাকের নকশার দিকে ইঙ্গিত করেন সঞ্জয়। দর্শকদের কাছে এটি ছিল নিছক ফ্যাশনের প্রদর্শন নয়; বরং নিজের জন্মভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও গর্ব প্রকাশের এক ভিন্নধর্মী উপায়। তার এই উপস্থাপনা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশ-বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখও সঞ্জয়ের এই অর্জনের প্রশংসা করেছেন।
সংগীতশিল্পী প্রীতম হাসান, আলিফ আলাউদ্দিনসহ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিবেশনার ভিডিও শেয়ার করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বিশাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতেও ভুল করেননি সঞ্জয়। পারফরম্যান্সের একটি ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, “আমার মানুষগুলো, এটি কেবল সুন্দর কিছুর শুরু।” সংক্ষিপ্ত এই বার্তাই তার স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করে।
সঞ্জয়ের জীবনের গল্পও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার। বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ১৯৯১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে। পরে মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজস্ব সংগীতধারা গড়ে তোলেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, বিভিন্ন সংস্কৃতির মিশ্র অভিজ্ঞতাই তার শিল্পীসত্ত্বাকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তার এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে। আর সেই সাফল্যের গল্পে লাল-সবুজের উপস্থিতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া কোটি মানুষের কাছে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচিত করে তুলছে।
সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসার শুরু পরিবার থেকেই। মা মিতা দেব গান গাইতেন, আর ছোটবেলায় মায়ের গানের সঙ্গে তবলা বাজাতেন সঞ্জয়। নানিও ছিলেন সংগীতপ্রেমী। তাদের কাছ থেকেই সংগীতের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে তার। সঞ্জয়ের বিশ্বাস, বাংলাদেশের সংগীত বিশ্বে দারুণভাবে জায়গা করে নিতে পারে। তাই তার স্বপ্ন শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করা নয়, বরং বাংলা গান ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
