বগুড়াকে ‘হেলদি নগরী’ হিসেবে গড়ে তুলতে নানামুখী প্রস্তাব

ফন্ট সাইজ:

ঐতিহাসিক পুণ্ড্রবর্ধনের গৌরবময় ঐতিহ্যকে ধারণ করে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও টেকসই নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনকে। গতানুগতিক নগরায়ণের বাইরে গিয়ে পুরো শহরকে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট জোনে ভাগ করে একটি দূরদর্শী ‘মডেল সিটি’ প্রতিষ্ঠার মহাপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল বগুড়ার সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারি মহিলা কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকরা এই আশাবাদ ও কর্মপরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। ‘টেকসই জীবনমান গবেষণা কেন্দ্র’ আয়োজিত এই সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের টেকসই উন্নয়নে নাগরিক সমস্যা ও প্রত্যাশা’।

সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মো. বেল্লাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নওগাঁর বদলগাছী সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. আলমগীর হাসান। সেমিনারে বক্তারা বগুড়াকে একটি বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত ‘হেলদি নগরী’ হিসেবে গড়ে তুলতে নানামুখী উদ্ভাবনী প্রস্তাব ও নাগরিক সংকট উত্তরণের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন।
বগুড়ার এই ঐতিহাসিক রূপান্তরকে টেকসই করতে সেমিনারে অংশ নেয়া বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় মতামত তুলে ধরেছেন।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ড. আলমগীর হাসান বগুড়াকে একটি পরিকল্পিত ও স্বাস্থ্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে জোনভিত্তিক মডেলের প্রস্তাব করেন। তার নকশা অনুযায়ী, শহরের পূর্ব-পশ্চিম বরাবর তিনটি প্রধান সড়ক থাকবে। এ ছাড়া, উত্তর-পশ্চিমে ‘টেকসই প্রযুক্তি হাইটেক পার্ক’, দক্ষিণ-পশ্চিমে উন্নত চিকিৎসা সেবার জন্য ‘হেলথ সিটি জোন’, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন জোন’, দক্ষিণ-পূর্বে ‘বাণিজ্যিক জোন’ এবং শহরের কেন্দ্রভাগে ‘প্রশাসনিক ও ট্রানজিট জোন’ প্রতিষ্ঠার ব্লু-প্রিন্ট তুলে ধরেন তিনি। সেমিনারের সভাপতি প্রফেসর ড. বেল্লাল হোসেন এই ধারণাকে জোরালো সমর্থন দিয়ে বলেন, শহরকে প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও আবাসিক জোনে বিভক্ত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে হবে। একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের আধুনিক নগরায়ণের মডেলটি যেন অবশ্যই প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে। সিটি প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বগুড়াকে আধুনিক রূপ দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে জানান, শহরের উপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমাতে ইতিমধ্যেই বিকেন্দ্রীকরণের কাজ শুরু হয়েছে এবং ঠনঠনিয়া বাসস্ট্যান্ডকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বগুড়াকে সত্যিকার অর্থে টেকসই করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয় বরং সবার আন্তরিক সহযোগিতা এবং ‘স্মার্ট নাগরিক’ গড়ে তোলা জরুরি। অন্যদিকে, গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে গবেষণা কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক ড. মনসুর আহমেদ জানান, যেকোনো টেকসই নগর পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হতে হবে একটি নিখুঁত ‘বেজমেন্ট সার্ভে’ বা ভিত্তি জরিপ, যা ভবিষ্যতের যেকোনো উন্নয়নকে সঠিক পথ দেখাবে।

সেমিনারের মূল আলোচক বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট এ কে এম মাহবুবুর রহমান বগুড়া ১৮৭৬ সাল থেকে শুরু করে আজকের সিটি করপোরেশন হয়ে ওঠার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সদ্য সিটি গঠন বগুড়াবাসীর জন্য এক অভূতপূর্ব নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি আদর্শ শহর গড়তে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসনে লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় কঠোর শৃঙ্খলা আনা এবং পর্যাপ্ত গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করার তাগিদ দেন।
ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে সুর মিলিয়ে পল্লী উন্নয়ন একাডেমি’র (আরডিএ) পরিচালক ড. শেখ মেহেদী মোহাম্মদ পরামর্শ দেন, শহরের পূর্ব-পশ্চিমের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাকে অতি দ্রুত ফোর লেনে (চার লেন) উন্নীত করা প্রয়োজন।
নাগরিক জীবনের মানদণ্ড উন্নয়নে টিএমএসএসের উপ-নির্বাহী পরিচালক ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, শুধু শহরের কেন্দ্রে নয়, বরং প্রতিটি জোনেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি আজিজুল হক কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান প্রফেসর মো. রফিকুল ইসলাম নগরের উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার এক চমৎকার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নগর পরিচালন ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কিত ‘সহশিক্ষা কার্যক্রম’ চালু করা উচিত। এ ছাড়া, নাগরিক সেবার সুষম বণ্টনের উপর জোর দিয়ে প্রভাষক মাসফিকুর রহমান বায়েজিদ বলেন, সিটির প্রতিটি ওয়ার্ডের নাগরিকরা যেন সমান সুযোগ-সুবিধা পান এবং সেবাপ্রাপ্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা দরকার। আর এই সামগ্রিক উন্নয়নকে নিয়মের মধ্যে রাখতে গবেষণা কেন্দ্রের কো-চেয়ারপারসন ড. শাহাদৎ হোসেন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের উপর গুরুত্বারোপ করেন।

সরকারি মজিবর রহমান ভান্ডারি মহিলা কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড. ত্বাইফ মামুন মজিদের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- শাহ সুলতান কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. সাহিদুর রহমান, সরকারি আজিজুল হক কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আব্দুল মতিন, ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. শাহাজাহান আলী, ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক টিপু সুলতান, মোছা. মাছুমা আক্তার জাহান, সরকারি শাহ সুলতান কলেজের অধ্যাপক মো. আব্দুল করিম, সহযোগী অধ্যাপক অরূপ কুমার কুণ্ডু।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন